লকডাউনই যখন মুখ্য সমাধান, তবুও প্রত্যাহার দেশে দেশে!পাঠের সময় : 6 মিনিট

প্রতিনিয়তই দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি, বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। সর্বগ্রাসী এই করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯)-এর আতঙ্কের মাঝেই ছয় মাস পাড় করল বিশ্ববাসী। সম্পূর্ণ প্রতিষেধকবিহীন এই ভাইরাস মোকাবেলায় লকডাউনই ছিল প্রধান হাতিয়ার। গবেষণাভিত্তিক জার্নাল ‘ন্যাচার’ -এ প্রকাশিত ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যথাযথ সময়ে গৃহবন্দি থাকার কারণে প্রাণে বেঁচেছেন প্রায় ৩১ লাখ মানুষ। এছাড়া ৮২ শতাংশ পর্যন্ত রোধ করা গেছে করোনা ভাইরাসের বিস্তার। 

এই বিষয়ে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডঃ সামির ভাট বলেন, লকডাউন প্রত্যাহারের জন্য তড়িঘড়ি চলছে অথচ এই সিদ্ধান্তের কারণে প্রাণে বেঁচেছেন লাখ লাখ মানুষ। কঠোর বিধি-নিষেধ শিথিলের কারণে দ্বিতীয় দফায় কভিড-১৯ এর ধাক্কা সামলাতে হবে বিশ্ববাসীকে। আর সেটা আগামী দুই মাসের মধ্যেই স্পষ্ট হবে।

গবেষণায় আরও বলা হয় সরকার যদি লকডাউন না দিত তাহলে ১১টি ইউরোপীয় দেশে আক্রান্ত হত অন্তত দেড় কোটি মানুষ, যা দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার চার ভাগেরও বেশী।

এমতাবস্থায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র হুমকি, সময়ের সাথে আরও খারাপের দিকে যাবে করোনার ভাইরাসের পরিস্থিতি। 

বিগত দুই মাসে মোট মৃত্যুর ৭৫ শতাংশই হয়েছে আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায়।

অবশ্য কোন শঙ্কা-হুঁশিয়ারির তোয়াক্কা করছে না করোনা ভাইরাসের ‘পিক পয়েন্ট’-এ থাকা রাশিয়া। পুরোপুরি তুলে নিয়েছে লকডাউন। 

ব্রাজিলঃ

কঠোর বিধি-নিষেধ মেনে হোটেল, বাঁর, ফুটবল স্টেডিয়াম, সমুদ্র উপকূল খুলে দিয়েছে ‘হটস্পট’ ব্রাজিল। অথচ সেখানে নথিভুক্ত আক্রান্তের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। গত শুক্রবার ব্রাজিলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতে জানিয়েছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫৪ হাজারেরও অধিক, যা একদিনে দেশটির সর্বোচ্চ আক্রান্তের রেকর্ড। দৈনিক প্রাণহানির ঘটনাও ১২০০র অধিক। এখন পর্যন্ত দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৪৯ হাজার ছাড়িয়েছে। 

তবে সরকারি এই হিসাব নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে স্বাস্থ্য বিশারদদের। তাদের মতে নমুনা সংগ্রহের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় সংক্রমণের সঠিক চিত্রটা ফুটে উঠছে না। 

করোনা সংক্রমণ ও মৃতের দিক দিয়ে ইতোমধ্যে বিশ্বে ২য় অবস্থানে উঠে এসেছে লাতিন আমেরিকার দেশটি।

দেশটিতে করোনায় সবথেকে ভুক্তভোগী দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ।

বিশ্লেষকদের মতে প্রেসিডেন্ট বোলসোনেরোর দায়িত্ব অবহেলার কারণে ব্রাজিলকে এরকম সংকটপূর্ণ অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। তিনি সঠিক সময়ে সঠিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন নি। দেশটিকে কার্যকর লকডাউনের আনতে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।

উল্লেখ্য, ব্রাজিলের কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনেরো মহামারির শুরু থেকেই ভাইরাসটিকে বেশ ‘হালকাভাবে’ নিয়েছিলেন।

তিনি করোনা ভাইরাসকে ‘সামান্য ফ্লু জাতীয়’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রঃ

এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত কিংবা মৃত্যু দুই দিক দিয়েই শীর্ষে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইতোমধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ২১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে আর মৃত্যু ১ লাখের গণ্ডি পেরিয়েছে। বিশ্লেষকদের দাবি আমেরিকা তাদের দৈনিক সর্বোচ্চ মৃত্যু ও আক্রান্তের ‘পিক টাইম’ পার করেছে। তবু এখন পর্যন্ত দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ৭০০র অধিক। 

এই যখন অবস্থা তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি করোনা ভাইরাস তাদের নিয়ন্ত্রণে। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, তাদের অনুমান ছিল পুরো আমেরিকায় ২৫ লাখ মানুষ করোনায় হতে পারে। সেই অনুমান থেকে তারা সংখ্যাটা অনেকাংশেই কমিয়ে আনতে পেরেছে। তিনি পুনরায় সমগ্র আমেরিকায় কর্ম চাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী। এছাড়া এই বছরের শেষ নাগাদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের নিয়েও বেশ আশাবাদী। 

তবে করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় ট্রাম্প প্রশাসনের ভুমিকা নিয়ে রয়েছে বেশ সমালোচনা। অভিযোগ রয়েছে, করোনা ভাইরাস যখন ইউরোপে আক্রমণ করে তখন ট্রাম্প প্রশাসন এই ভাইরাস মোকাবেলা তো দূরে থাক পাত্তা পর্যন্ত দেয় নি। এমনকি মরণঘাতী করোনা তার ভয়াল থাবায় যখন ইতালিকে বিপর্যস্ত করে তুলে তখনও ট্রাম্প প্রশাসনের ভুমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। 

বিশ্লেষকদের দাবি ট্রাম্প প্রশাসনের অবহেলার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ভাইরাস এই বিরাট আকার ধারণ করেছে। তাদের মতে, যথাসময়ে ইউরোপ ও চীনের সাথে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পিত লকডাউনের মাধ্যমে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অনেকটায় কমানো যেত। 

ইউরোপঃ

এই মহাদেশের বেশ কয়েকটি দেশ বাদে বেশির ভাগই লকডাউন প্রত্যাহার করেছে। তবে কোন দেশই পুরোপুরি লকডাউন প্রত্যাহার করেনি। চলছে এলাকা বা জোনভিত্তিক লকডাউন। দীর্ঘদিন যাবত ঘরবন্দি থাকার কারণে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। 

সংক্রমণের ‘পিক টাইম’ পাড় করে ইতালির গ্রাফটা এখন অনেকটায় নিম্নগামী। যদিও প্রতিনিয়তই ঘটছে নতুন সংক্রমণের ঘটনা। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৩৮ হাজারের মতো এবং মৃত্যু ৩৪ হাজারের মতো।

অপরদিকে ইউরোপের আরেক দেশ স্পেনে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৯৩ হাজার এবং মৃত্যু ২৮ হাজারের অধিক।

এছাড়া যুক্তরাজ্য, পর্তুগালের সংক্রমণের গ্রাফটাও কিছুটা নিম্নগামী।

তবে পশ্চিমা স্বাস্থ্য বিশারদদের আশংকা সংক্রমণের হার কমে গেছে এই নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগে গণহারে লকডাউন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে। তারা এও বলেছেন যে কোন সময় ইউরোপ দ্বিতীয় দফায় করোনা আক্রমণের স্বীকার হতে পারে। যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে সেই সংক্রমণে প্রথম দফা থেকেও ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের আরও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে।

ভারতঃ

প্রতিবেশি দেশ ভারতে করোনা আক্রান্তের রোগীর সংখ্যা যেন হু হু করে বাড়ছে। প্রতিদিনই হচ্ছে নতুন নতুন রেকর্ড। সব মিলিয়ে দেশটিতে আক্রান্তের রোগীর সংখ্যা প্রায় চার লাখের কাছাকাছি। ২৮টি রাজ্যের মধ্যে মাত্র চারটি রাজ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা আড়াই লাখের বেশি। রাজ্যগুলো হল তামিলনাড়ু, গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও দিল্লী।

আক্রান্তের পাশাপাশি মৃতের সংখ্যাও উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। মৃতের সংখ্যা ১৩ হাজার ছুঁইছুঁই। শুধুমাত্র মহারাষ্ট্রেই মারা গেছে ৬ হাজারের মতো। দিল্লীতে ২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। গুজরাটে সংখ্যাটা ১৬০০র অধিক। এছাড়া তামিলনাড়ু, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থান, তেলেঙ্গানা, হরিয়ানা, কর্ণাটকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। শুধুমাত্র শেষ ৩৩ দিনে মৃতের সংখ্যা ১৩ হাজার ছাড়িয়েছে। 

এই যখন গোটা ভারতের চিত্র তখন কেন্দ্রীয় সরকার চিন্তা করছে লকডাউন প্রত্যাহারের কথা। ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে আনলক কার্যক্রম।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আর কখনো পুরো দেশ একসাথে লকডাউন হবে না তবে প্রয়োজন অনুযায়ী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীগণ নিজ নিজ রাজ্যের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন।

পাকিস্তানঃ

ভারতের মতো পাকিস্তানেও করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। 

দেশটিতে এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাব মতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৭২ হাজারের মতো। মারা গেছে ৪ হাজারের কাছাকাছি। 

দিনে দিনে তীব্রতর হচ্ছে চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকট। ২২ কোটি পাকিস্তানীদের জন্য আইসিইউ বেড রয়েছে মাত্র ৩৩০ টি, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে অপ্রতুল। জোড়াতালি দিয়ে কোনমতে চলছে করোনায় আক্রান্তদের শুশ্রুষা।

এমতাবস্থায় সবদিক বিবেচনা করে কঠোর লকডাউনের সুপারিশ করেছিল পাকিস্তানের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু অর্থনৈতিক দিক থেকে কোণঠাসায় থাকা ইমরান খানের সরকার কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপে সম্মত হয় নি।

ফলসরূপ এর ভয়াবহ পরিণতি ভালোয় টের পাচ্ছে পাকিস্তান।

চীনঃ

করোনার উৎপত্তিস্থল চীনের ওহানে ভাইরাসের বৃষ্টি কমে আসায় সমাজতন্ত্রী চীন সরকার সেখান থেকে লকডাউন প্রত্যাহার করে নেয়। মূলত লকডাউনের কারণে যে কয়টি দেশ বেশ সুফল পায়। এর মধ্যে চীন সম্ভবত সবার উপরেই থাকবে। 

কঠোর বিধি-নিষেধ কিংবা লকডাউন সবকিছুতেই অনমনীয় ছিল সামজতন্ত্রী চীন সরকার। যার সুফলও হাতেনাতে পেয়েছে তারা। সংক্রমণ ও মৃত্যু দুই দিকেই শূন্যের কোটায় চলে গিয়েছিল প্রায়।

সবকিছুই পরিকল্পনামাফিক চলছিল। করোনার বিরুদ্ধে রীতিমতো ‘বিজয় উদযাপন’ শুরু করেছিল চীনারা। কিন্তু হঠাৎ ছন্দপতন, দ্বিতীয় দফায় করোনার আক্রমণের শিকার চীন।

এইবারের সংক্রমণর কেন্দ্রস্থল রাজধানী বেইজিং। ধারণা করা হচ্ছে, শহরের একটি বড় পাইকারি বাজার থেকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে। এরই মধ্যে বাজারটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। লকডাউন করা হয়েছে আশেপাশের ৩৩টি জনবহুল এলাকা।

উল্লেখ্য, গত ৬ই জুন রাজধানী বেইজিং-র বেশির ভাগ এলাকা লকডাউন প্রত্যাহার করা হয়, এর ঠিক ১০ দিনের মাথায় দ্বিতীয়বারের মতো চীনে সংক্রমণের ঘটনা ঘটল।

বাংলাদেশঃ

মার্চে প্রথম সংক্রমণ এরপর থেকে গ্রাফটা শুধু ঊর্ধ্বগামীই হয়েছে। এরইমধ্যে সংক্রমণের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, মৃত্যু ১৫০০ ছুঁইছুঁই।

সংক্রমণের পরপরই বন্ধ করে দেওয়া হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সারাদেশে জারি করা হয় কঠোর লকডাউন। কিন্তু লকডাউন শব্দটা বাংলাদেশের মফস্বল কিংবা প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষদের জন্য একেবারেই নতুন। 

শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করে আসছিল মাঠ পর্যায়ে মানুষ সচেতন হচ্ছে না। আর মানুষ সচেতন না হলে লকডাউনের সুফল দৃশ্যমান হবে না। 

সামাজিক নিরাপত্তা দূরত্ব বজায় রাখা তো দুরের কথা কোথাও কোথাও মাস্ক পরিধান করা মানুষদের খুঁজে পাওয়া মুশকিল ছিল। লকডাউনের কারণে তৈরি পোশাক খাতের ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এমন আশংকায় আস্তে আস্তে খুলে দেয়া হয় গার্মেন্টসগুলো। 

যার পুরো প্রভাব পড়ে রাজধানী ঢাকাসহ পাশ্ববর্তী শহর গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের উপর। পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে সংক্রমণ ও আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুর সংখ্যা।

সারাদেশ থেকে লকডাউন প্রত্যাহারের পর এখন চলছে এলাকাভিত্তিক লকডাউন। 

ঢাকার পূর্ব রাজাবাজার, মিরপুর, ধানমন্ডি, উত্তরা, লালবাগসহ গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বেশ কিছু এলাকাকে ‘রেড জোন’ -র আওতায় আনা হয়েছে।

কিন্তু বিশ্লেষকদের অভিযোগ ‘রেড জোন’-এ থাকা এলাকাগুলোতে ঠিকমত মানা হচ্ছে না কঠোর বিধি-নিষেধ। 

এমতাবস্থায় লকডাউন কতটা কার্যকর হবে তা নিতে বিশেষজ্ঞ মহলে উঠছে প্রশ্ন। তাদের ভাষ্যমতে, প্রতিষেধক না থাকায় লকডাউনই ছিল আমাদের একমাত্র অস্ত্র। সেই অস্ত্রকেই যদি ঠিকমত কাজে লাগানো না যায় তবে শত্রু পরাভূত হবে কীসে?

ব্রেকিং নিউজ