স্বল্প বাজেটে কক্সবাজার ভ্রমন গাইডপাঠের সময় : 6 মিনিট

বাংলাদেশের ভেতর ভ্রমনের চিন্তা আসলেই প্রথমেই মাথায় আসে কক্সবাজার।প্রতিবছর শুধুমাত্র দেশে নয় বিদেশ থেকেও এখানে ঘুরতে আসেন লক্ষ লক্ষ পর্যটক।কক্সবাজার বীচ ১২৫কিমি দীর্ঘ।বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মৎস্যবন্দর ও এখানেই।  এছাড়াও কক্সবাজার এ আছে বাংলাদেশের একমাত্র কোরাল আইল্যান্ড সেন্টমার্টিন ।  মহেশখালি আর সোনাদিয়া দ্বীপও এই জেলায়ই অবস্থিত।সাথে দেখতে পাবেন কিছু প্রাকিতিক বন ও পাহাড়।আর এইগুলোই এই জেলাকে সারাবছর সবসময় পর্যটকমুখর করে রাখে।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ সী-বীচ কক্সবাজার ঘুরে আসার সপ্ন সবারই থাকে।আর ভ্রমন মানেই বাজেটের দিকে মনোযোগ তো দিতেই হয়।অল্পকিছু সহজ টিপস জানা থাকলে আপনিও পারবেন কম খরচে সর্ববৃহৎ সী-বীচ কক্সবাজার ঘুরে আসতে…

সময়ঃ

কম খরচে কক্সবাজার ঘুরে আসতে চাইলে আপনাকে প্রথমেই জানতে হবে সিজন টাইম।এখানে পিকসিজন শুরু হয় অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত।এই সময় বৃষ্টি না থাকায় অনেক পর্যটকের আগমন ঘটে।পিক সিজনে আগেভাগে বুকিং না করে ঢাকা থেকে  রওনা দেওয়া বোকামি।বাজেট কমাতে চাইলে ঠিক করতে হবে অফসিজনের প্লান।আর এতেই আপনার খরচ কমে আসবে ৫০ ভাগ।অফসিজনে হোটেল গুলোও ৫০% থেকে ৬০% ডিস্কাউন্ট দেয়।কিন্তু অফসিজনে ঢেউ এর উচ্চতা বেশি থাকায় সেন্টমার্টিন যাওয়া বন্ধ থাকে।সেন্টমার্টিনের জাহাজ শুধুমাত্র অক্টবার থেকে মার্চ পর্যন্ত চলে।

যাতায়াতঃ

যাতায়াতে রয়েছে চার ধরনের পথ ।সবচেয়ে দ্রুত যেতে পারেন বিমানে।আকাশপথে ওয়ানওয়ে ফ্লাইট এর দাম পরতে পারে ৪০০০ টাকা থেকে। বাজেট বেশি হলে এসি বাসেও যেতে পারেন।কক্সবাজার এর দূরত্ব ঢাকা থেকে ৩৮৭.৫ কিমি।খরচ পরবে ১৮০০-২০০০।কক্সবাজারের বাস সরাসরি ঢাকাছাড়াও দেশের প্রধান শহরগুলিতে যায়। উদাহরণস্বরূপ, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, রংপুর ইত্যাদি। মাঝারি বাজেট থাকলে যেতে পারেন নন এসি বাস এ। ঢাকা থেকে প্রচুর নন-এসি বাস যেমন শ্যামলী, টিআর, হানিফ, ইউনিক, এস আলম, সাদিয়া, ইত্যাদি যায়। ভাড়া ৮০০ টাকা থেকে শুরু। আর যদি গ্রিন লাইন, সৌদিয়া, দেশ ট্র্যাভেলস, টিআর, সোহাগ ইত্যাদি থাকে তবে ভাড়া হবে ১৬০০ (ইকোনমি ক্লাস) – ২০০০ টাকা (বিজনেস ক্লাস)। বাসে ১০-১২ ঘন্টা সময় নিতে পারে। কক্সবাজারের গাড়ি প্রতি ঘন্টায় চট্টগ্রাম থেকে পাওয়া যায়। যদিও বেশিরভাগ গাড়ি চরম লোকাল । এস আলম ও সাদিয়াও ভাল সেবা দিচ্ছে। গাবতলি/সায়দাবাদ/শ্যামলী থেকে টিকেট কেটে ফেলুন,৮০০ টাকায় হয়ে যাবে।আর বাজেট কম হলে নিতে পারেন ট্রেন এর যাত্রা, ৫০০-৬০০ এর মধ্যে পৌঁছে যাবেন সর্ববৃহৎ সী-বীচ কক্সবাজার। সন্ধ্যার বাস ধরাটাই ভাল,এক্সট্রা হিসেবে দেখতে পাবেন পরের দিনের সূর্যোদয়।

হোটেলঃ

বাস থেকে নেমেই হোটেল খোঁজা জরুরি।এখানেও বাজেট বেশি হলে থাকতে পারেন সী-বীচের পাড়ে বেশ ভাল হোটেলগুলোতে।ফাইভস্টার হোটেল গুলোতেও থাকতে পারেন আরামসে।কক্সবাজারের হোটেল গুলোর ধারনক্ষমতা মোট ১,৫০,০০০।তাই পিক সিজনেও হোটেলে রুম পাওয়া সম্ভব।কিন্তু এই রিস্ক ডিসেম্বার বা বছরের শুরুতে নাও খাটতে পারে।হোটেল আর রিসোর্ট গুলো পাবেন কলাতলি এবং লাবনি পয়েন্ট এ।কিছু হোটেল আছে ইনানির দিকে।কিন্তু অফসিজনের টিপস এখানে খাটবে না।সব সিজনেই দাম ৪-৮ হাজারের মত।মিডিয়াম বাজেট হলে দেখতে পারেন রোডের পাশের হোটেলগুলো। ৮০০-১০০০ এ পেয়ে যাবেন ডাবল বেডের রুমগুলো।আরও কম বাজেট হলে যেতে পারেন আরো ভেতরের দিকে। ৬০০-৭০০ তে মিলতে পারে ৮ জনের এসি রুমও ! কিন্তু দলবেধে না গেলে নিরাপত্তার ঝুকি থেকে যায় কমদামি এই হোটেলগুলোতে। (বাস থেকে নেমে আটোওয়ালাকে বললেই আপনার বাজেট অনুযায়ী নিয়ে যাবে হোটেলগুলোতে।তবে অটোথেকে নেমেই তাকে ভাড়া দিয়ে বিদেয় করাই ভাল)।

রুম আর সিকিউরিটি সরাসরি দেখে হোটেল বুক দিতে হবে।

খাওয়াঃ

পর্যটন এলাকা হিসেবে কক্সবাজার এর খাবারের দাম অনেক বেসি।কম বাজেটে খেতে চাইলে বিচের পাড়ের হোটেল গুলোতে খাবারের পার্টটা চুকিয়ে নিতে পারেন।আর রসনাবিলাসি হলে যেতে পারেন “রান্নাঘর”,”ঝাউবন” এগুলোতে।

দর্শনীয় স্থানঃ

১. সৈকতঃ

কক্সবাজারের তিনটি সৈকত বেশ বিখ্যাত। লাবনী, সুগন্ধা, কলাতলী বিচ। কলাতলী সমুদ্র সৈকত তুলনামূলকভাবে কম ভিড় এবং সর্বাধিক জনাকীর্ণ সৈকত হ’ল সুগন্ধা। সময়ের সাথে সাথে আপনি তিনটি সৈকতই ঘুরে দেখতে পারেন। গোসলের সময় দেখে নিন, লাল পতাকার সময় জলে  না যাওয়ার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করুন। ৫০-৬০ টাকার ভাড়া সহ ৩-৪ ঘন্টার জন্য সৈকতের চেয়ারগুলি পাওয়া যায়। একই ভাড়াতে আপনি একটি রাবার টিউবও পাবেন।

২. বার্মিজ মার্কেটঃ

শহরের বার্মিজ মার্কেট একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। বার্মা এবং চীন থেকে আসে এমন অনেক পণ্য রয়েছে। বিভিন্ন ধরণের আচার, পোশাক, উপহারের আইটেমও পেয়ে যাবেন।

৩.হিমছড়িঃ

হিমছড়ি কক্সবাজারে মেরিনড্রাইভে ১৮ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত। এখানে প্রধান আকর্ষণ সবুজ পাহাড় এবং ঝর্ণা । কক্সবাজার থেকে হিমাচড়ির পথে আরেকটি আকর্ষণ হ’ল সবুজ-পাহাড় ঘেরা আকাবাকা পথ । পথের বাম দিকে উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড় এবং ডানদিকে নীল জলের তরঙ্গ। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়গুলো আরও প্রাণবন্ত এবং সজিব থাকে। পাহাড়ের চূড়ায় একটি রিসর্টও রয়েছে, যা থেকে বিশাল নীল সমুদ্র সহজেই দেখা যায়।

৪. ইনানী বিচঃ

ইনানী বিচ কক্সবাজারের অন্যতম আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকত। এটি কক্সবাজার থেকে 35 কিলোমিটার দূরে। বিস্ময়কর সৌন্দর্যে ঘেরা এই সৈকতটি পর্যটকদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। আমরা জানি যে কক্সবাজারের সৈকতগুলি কিছুটা নোংরা বা ঢালু ,কিন্তু ইনানী বিচের জল খুব পরিষ্কার, এটি সমুদ্রের তীরে পর্যটকদের জন্য একটি দুর্দান্ত জায়গা হিসাবে বিবেচিত হয়। জোয়ারের সময় অনেক প্রবাল প্রাচীর সাগরে দেখা যায়।

৫. দুলাহাজারা সাফারি পার্কঃ

এটি বাংলাদেশের প্রথম সাফারি পার্ক। পার্কটির পার্বত্য অঞ্চলে ২,২২৪ একর জায়গা নিয়ে এটি বিদ্যমান। এই সাফারি পার্কটি কক্সবাজারের 5 কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। সরকারী তথ্য অনুসারে, এখানে বিলুপ্তপ্রায় এবং বিরল প্রজাতির  অনেক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রজনন এখানে করা হচ্ছে। দুলহাজারা সাফারি পার্ক বিনোদন দেওয়ার জন্যও পর্যটকদের  একটি আকর্ষনের কেন্দ্র। বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক হাজার প্রাণী রয়েছে।

৬. সেন্ট মার্টিন এবং ছেরাদ্বীপঃ

সেন্ট মার্টিনস, জেলা শহর থেকে প্রায় 120 কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের গভীরে একটি ছোট দ্বীপ। এর আকার প্রায় 8 বর্গকিলোমিটার। কক্সবাজার থেকে, স্থানীয় বাস বা জীপগুলি টেকনাফ নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে নিয়মিত জাহাজ বা সি-ট্রাকে সেন্ট মার্টিনে যাওয়া যায়। টেকনাফ পৌঁছাতে এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় লাগবে এবং সেখান থেকে সমুদ্রপথে সেন্ট মার্টিন পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘন্টা সময় লাগে। ছেরাদ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত একটি নয়নাভিরাম দ্বীপ। সেন্টমার্টিন থেকে 40 মিনিটের পথে জাহাজে ছেরাদ্বীপ যাওয়া যায়।

৭. মহেশখালী ও সোনাদিয়া দ্বীপপুঞ্জঃ

অনেক আগে, দেশের একমাত্র পার্বত্য এই দ্বীপটি তীব্র ভূমিকম্পের সময় জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। কক্সবাজার থেকে মহেশখালীর দূরত্ব 12 কিলোমিটার। স্পিডবোটে যেতে চল্লিশ মিনিট সময় লাগে। মহেশখালী বাংলাদেশের বৃহত্তম শুটকি মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল । এখানে অনেক জলাভূমিও আছে। শীত মৌসুমে অনেক অতিথি পাখিও দেখা যায়। এ ছাড়া পাহাড়ের শীর্ষে রয়েছে আদিনাথ মন্দির। সোনাদিয়া মহেশখালী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন আরেকটি দ্বীপ। সৌন্দর্যের জলাধার দৈর্ঘ্যে 2.5 কিলোমিটার প্রশস্ত সোনাদিয়া একটি অনন্য প্রাকৃতিক সৈকত।অনেক প্রজাতির জলজ প্রানিও রয়েছে এখানে। এই দ্বীপের সৈকত অসংখ্য লাল কাঁকড়াতে পূর্ণ।

৮. রামু বৌদ্ধ বিহারঃ

কক্সবাজারের রামু থানা বৌদ্ধদের জন্য বিখ্যাত। এটি কক্সবাজার থেকে মাত্র 14 কিলোমিটার দূরে। এটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র স্থান। এখানে রয়েছে বৌদ্ধ মন্দির, প্যাগোডা, ধাতু ও ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি বৌদ্ধ মূর্তি, ছোট ও বড় বৌদ্ধ মূর্তিযুক্ত লাল সিংহ এবং এর পাশে ‘হোয়াইট সিং’ নামে একটি বৌদ্ধ বিহার রয়েছে। এছাড়াও একটি ১৩ ফুট উচ্চ ব্রোঞ্জ বুদ্ধ মূর্তি রয়েছে যা প্রচুর পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এটি ছাড়াও, রাবার বাগান, স্থানীয় রাখাইন এবং বৃহত্তর সম্প্রদায়ের জীবন ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ রয়েছে এখানে ।

ঘুরাঘুরিঃ(যা না করলেই নয়)

আশেপাশে ঘুরাঘুরির জন্য ইনানী আর হিমছড়ি যেতে পারেন। হিমছড়ি গেলে অটোতে গেলে দেখতে পাবেন আশেপাশের দ্রিশয।ভাড়া জনপ্রতি ২০-২৫ টাকা।রিজার্ভ নিতে চাইলে একবেলা ভাড়া পরবে ৩০০-৪– টাকা।হিমছড়ি গিয়ে টিকেট কেটে যাবেন পাহাড়ের দিকে।উপড়ে উঠলে আর নামতে মন চাইবে না।এই দৃশ্য মিস করলে কক্সবাজার আসাটাই বৃথা হয়ে যেতে পারে।ইনানী যেতে চাইলে অটো নেয়াই ভাল।নাহলে আসার সময় কোনো কিছুই পাবেন না।ইনানীর সূর্যাস্ত এককথায় অসাধারন।ভাড়া পরবে ৬০-৭০ টাকা,পুরো দিনের জন্য ১০০০-১২০০ নিতে পারে।ঘুরে আসতে পারেন মহেশখালিও।

সিকিউরিটিঃ

বীচের সিকিউরিটি খুব ভাল।সাথে রাখতে পারেন আইডি কারড।গুগলে পেয়ে যাবেন পুলিশের সবকয়টি যোগাযোগের মাধযম।রাতে বীচে থাকতে পারেন, এখানে রাতে কলাতলি বীচে থাকাটাই ভাল।সাথে দামি জিনিস না রাখাই ভাল রাতের বেলা (কেমেরা,দামি ফোন)।বীচে কোনো ঝামেলা ছাড়াই রাত কাটাতে পারবেন।তবে রাতে বুঝেশুনে কাজ করাই শ্রেয়।

হিসেবঃ

চারজনের তিনদিনের ট্যুরের মধ্যে প্রতিজনের খরচটা এরকম…

১) যাওয়া+আসা (ঢাকা থেকে)=১৬০০টাকা

২)থাকা (তিন দিন) = ১০০০*৩=৩০০০/৪=৭৫০ টাকা

৩)খাওয়া=৪০০*৩=১২০০ টাকা

৪)আনুষাঙ্গিক=৫০০টাকা

মোট==৪১০০ টাকায় সহজেই ঘুরে আসতে পারবেন।

চাইলেই  বাজেট আরও কমানো যায়।ট্রেন এ যেয়ে ,একটু ভেতরের হোটেলে থাক্লে,অনেকে দলবেঁধে গেলে। আর খাওয়াদাওয়া তো পুরোটাই নিজেদের।মিডিয়াম বাজেটের একটা হিসেব এখানে দেওয়া আছে।

এভাবেই মোটামুটি বাজেটের মধ্যে চাইলেই  আপনিও ঘুরে আসতে পারেন সর্ববৃহৎ সী-বীচ কক্সবাজার।

ব্রেকিং নিউজ