শেষ পর্বঃ আজ শানুর মন ভালো নেই – ” অপূর্ণতার বিষাদ “পাঠের সময় : 5 মিনিট

লেখকঃ মোঃ মতিউল্লাহ

এক রাশ যন্ত্রনা নিয়ে সে তার ঘরে প্রবেশ করে আসাদকে বিথীর প্রসব বেদনার কথা জানালাে। খানিক পরেই বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পেল তারা দুজন। আসাদ দৌড়ে আনিসের ঘরে গেল। শানুও তার পিছু নিল। তার যে বাচ্চার কান্না সহ্য হয়না হাজারাে ব্যাথা সে একটা সন্তানের জন্য সহ্য করতে প্রস্তুত কিন্তু বিধাতা না দিলে তাে তার বিরুদ্ধে কিছু করার ক্ষমতা তার নেই। সে পা টিপে টিপে হেঁটে আনিসের ঘরের দরজায় গিয়ে দাড়ালেন। ইতিমধ্যে তার শ্বশুর বাচ্চার কানে আজান দেয়ার জন্য মােল্লা নিয়ে আসলেন। শ্বশুর ও মােল্লাকে একত্রে দেখে সে সরে গেল। মােল্লা সাহেব ঘরে ঢুকে বাচ্চার কানে আজান দিলাে। আজান দেয়া শেষ হলে বকশিস নিয়ে মােল্লা চলে গেল। মুসলিম শিশু জন্ম নিলে বাচ্চার কানে আজান দেয় হয়। আমরা জানি আজান নামাজের আহবান।নামাজের জন্য আহবান করার জন্যই আজান দেয় হয়। তবে শিশুর কানে কেন আজান দেয়া হয়? এর কি কোন স্বার্থকতা আছে? হয়তাে আছে,যার কারণে এই রীতি।

আমরা যদি মানুষের জীবনের দিকে লক্ষ করি তবে দেখতে পাই আজানহীন একটা নামাজের মধ্যে দিয়ে মানুষের জীবনের ইতি ঘটে।হয়তাে এটাই এই নামাজের আজান যা জন্মের সময় দেয়া হয়। মহান প্রষ্টার মহিমা এবং শিশুকে কল্যাণের পথে আহবান করাই সম্ভবত এই আজানের মূল স্বার্থকতা আসাদ আনিসের ঘর থেকে বের হলাে শানুকে বাচ্চা দেখাবে বলে। দরজায় শানু দাড়িয়ে। সে তাকে নিয়ে ঘরে ঢুকলাে বিথীর কাছ থেকে নবজাতক কে নিয়ে শানুর কোলে দিল আসাদ। শানু কোলে নিয়ে বুকে জড়ালেন। একটা স্বর্গ সুখ উপভােগ করলাে
সে। মুহূর্তেই তার সকল দুঃখ,কষ্ট যেন ধুলিসাৎ হয়ে গেল। আসাদ আপলােকে শানুর দিকে তাকিয়ে রইলাে কি মিষ্টি হাসি! হাসিতে যেন মুক্ত ঝড়ছে। সে ভাবলাে যদি তার ঘরে এইরকম কেউ আসতাে,তবে ঘরটা সবসময় শানুর হাসিতে আলােকিত ,কল্লোলিত থাকতাে। খানিকক্ষণ পরে বাচ্চা কেদে উঠলে শানু তাকে বিথীর কোলে দিয়ে বাচ্চার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করে তারা তাদের ঘরে চলে আসলাে। তারা বেশ খুশি,কারণ অন্যের সফলতা দেখে তারা হিংসা করে না।তাই বাড়ির প্রথম অতিথির আগমনে তাদের আনন্দ হলাে।শানু ঘরে ঢুকে রাতের খাবার পরিবেশন করলাে। দুজন খেতে বসলাে। সে বিছানায় তাকিয়ে দেখলাে ফুটফুটে এক শিশু বিছানায় শুয়ে পা নাড়িয়ে খেলছে। সে দেখছে আর খাচ্ছে। আবারও আসাদ মুক্তা ঝড়ানাে হাসি দেখলাে শানুর মুখে। সে তার দিকে তাকিয়ে রইলাে। সাহসা হেসে বললাে- কিগাে,ওরকম করে কি দেখছাে আর হাসছাে?

কিছু না বলে সে খাবার খেতে মনােযােগী হলাে।

মুখ থেকে হাসিটা উদাও হয়ে গেল আসাদের কাছে ব্যাপারটা ভালাে লাগেনি। কত সুন্দর করে হাসছিল,আমি বলার সাথে সাথে তার হাসি উদাও হয়ে গেল। সে রাগ করলাে না। বরং সে শানুকে বললাে- অনেকদিন হলাে তুমি নিজ হাতে আমায় খায়িয়ে দাও না। আজ তােমার হাতে খাবাে।

তার ছেলে মানুষী দেখে শানু হাসলাে। নিজের ভাতের থালা সরিয়ে সে আসাদের থালা হাতে নিলাে। আসাদ তার
থালা শানুর হাত থেকে নামিয়ে শানুর থালার ভাত খাওয়ার ইচ্ছা পােষণ করলাে। শানু আবারও হাসলাে। পাশাপাশি বসে শানু আসাদকে খায়িয়ে দিল।সে অনেক আনন্দ পেল।এভাবেই আসাদের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে সে নিজের কষ্টকে ভুলে থাকল। আসাদকে সে ছােট শিশুর মতাে ভালবাসে,আসাদও তার সাথে ছেলে মানুষী করে। আসাদ ঘরে না থাকলে শানু দক্ষিণের জানালাটা খুলে প্রকৃতি দেখে। দক্ষিণা বাতাসে সে আনমনে হয়ে যায়। ঘরে শিশুর উপস্থিতি অনুভব করে সে। সর্বক্ষণই মনে হয় সে শিশুদের সংস্পর্শে আছে। তাই সে আর এখন কাদে না।বড় আনন্দে তাদের দিন কাটতে লাগলাে। সময়ের সাথে সাথে সব কিছুর পরিবর্তন ঘটে। সময়ের সাথে মানুষের কোন পরিবর্তন না হলেও ঋতুর পরিবর্তন ঠিকই হয়। ঋতুর পরিবর্তন হলাে। শীতকালের আগমন হল। শীতকালে দিনের পরিধি ছােট। তাই আসাদ বেলা থাকতে ঘরে ফিরতে পারে না। শানুকে সময় দিতে পারে না। এতে শানুর কিঞ্চিত মন খারাপ হলাে কিন্তু সে পুরাে ব্যাপারটা বুঝলাে। তাই সে আসাদকে কোন পীড়া দেয় নি।

যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে লাগলাে শীতে সে একবার বাপের বাড়ি গেল। কদিন বেড়িয়ে পিঠা-পুলি খেয়ে আবার চলে আসলাে তখন প্রকৃতি কুয়াশার চাদরে আবৃত হয়ে গেল। আসাদ কাজে বের হয়েছে। শানু ঘরে একা। তার বড্ড মন খারাপ। একা একা কি ঘরে বসে থাকা যায়?একা সময় কাটালে সেখানে আপেক্ষিক তত্ত্ব কাজ করে।অল্প সময়টা দীর্ঘ হয়ে যায়।শানু ঘর গুছিয়ে দক্ষিণা জানালাটা খুলে শিকে ধরে দাড়ালাে।কুয়াশার কারণে সে কিছুই দেখলাে না।জানালা খােলা মাত্রই শৈত্য প্রবাহ জানালার দিয়ে তার ঘরে প্রবেশ করলাে। তার ঠান্ডা অনুভূত হলাে। গায়ে থাকা চাদরটা টেনে শরীরের অনাবৃত অংশগুলো আবৃত করলাে। আর ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে না। কোন
বাতাস তার গায়ে লাগছে না। সে আনমনে হলাে না। কল্পনার জগতে সে বিভোর হলাে না। বার বার চেষ্টা করলাে সে আনমনে হতে,পুরানাে দেখাগুলাে আবার দেখতে। পারলাে না সে। শীতকালে শৈত্য প্রবাহ উত্তর দিক থেকে বয়। আর কুয়াশা থাকলে পরিবেশ স্থবির থাকে,কোন বাতাস থাকে না। মন খারাপ করে সে জানালায় দাড়িয়ে রইলাে চোখের জল টলমল করে পড়তে লাগলাে। সময় কাটছে না। আসাদও আসছে না। শানু একাকী চিত্তে কুয়াশার পর্দা ভেদ করে তার দৃষ্টি অগ্রসর করতে চাইলাে,কিন্তু পারলাে না। প্রকৃতির সাথে এত সহজে পেরে উঠা যায় না।জীবনটাকে মাঝে মাঝে এত কষ্টকর মনে হয় তখন আর কিছুই ভালাে লাগে না। সবকিছু ছুড়ে ফেলে দিয়ে দূরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আসাদের নিঃস্বার্থ ভালবাসা জন্য সে তা পারে না। এই পৃথিবীতে কোন মানুষ স্বয়ংসম্পূর্ন নয়। কেউ সুখী নয়। সকলেরই কোন না কোন ইচ্ছা থাকে। আর সেই ইচ্ছাটা কখনাে পূরণ
হয় না। কিছু কিছু ইচ্ছা পূরণ না হওয়াটা জীবনের জন্য হয়তাে কল্যাণকর। কিন্তু একটা মেয়ের স্বার্থকতা? শানু মনে মনে চিন্তা করল একটা মেয়ের সকল প্রাপ্তিতাে মাতৃত্বে, যদি মা হতেই না পারলাম তবে তাে আর মেয়ে হয়ে জন্মে এই জগতে কোন স্বার্থকতা অর্জন করতে পারলাম না। আমার জীবনটাই বৃথা,আমি ব্যর্থ। লোকে বলে
আল্লাহ্ যা করেন ভালাের জন্যই করেন। মাতৃত্ব বিবাহিত নারীর জন্য গৌরব। কোন ভালাের জন্য আল্লাহ্ আমাকে এই গৌরব থেকে বঞ্চিত করলাে, কোন ভালাের জন্য তিনি আমায় নিঃসন্তান করে রাখলেন তা আমি জানি না। হয়তাে তিনিই ভালাে জানেন। আমার ভালাে চাইনা আমার একটা সন্তান চাই।

বিবাহিত নারীরা গৃহিনী এবং জননী হয়ে সংসারের সকল দায়িত্ব পালন করে। এই দুই ভূমিকা সঠিক ভাবে পালন করলেই নারী জীবন স্বার্থক। কিন্তু আমি?হাউমাউ করে কাদলাে শানু। কেঁদে জ্ঞান হারিয়ে ঘরের মেঝে পড়ে রইলাে সে।


যােহরের আজানের ধ্বনি তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করলাে। তার জ্ঞান ফিরে আসলাে। সে উঠে গােসল করতে গেল।গােসল সেরে ওযু করে ঘরে এসে নামাজের বিছানা পেতে নামাজ পড়ে মহান স্রষ্টার দরবারে সে তার মন ভাসনা প্রকাশ করলাে। দীর্ঘক্ষণ মােনাজাত করে সে আবার জানালায় দাড়ালাে। একটা শূণ্যতা অনুভব করলাে সে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।নিজের অজান্তেই ঠোট কেপে উঠল তার। সে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে শুরু করলাে। জানালার শিকে দুই হাত রেখে দুই হাতে মাথাটা গুজে দিয়ে দাড়িয়ে সে অঝড়ে কান্না করছে। চোখে জল বন্যা নেমেছে।কোন ভাবেই সে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারলাে না। কেউ আসলাে না তাকে থামাতে,সান্তনা দিতে। ব্যাকুল হয়ে সে কান্না করেই যাচ্ছে।

আসাদও আসছে না ঘরে
সময়ও যেন কাটছে না কোনভাবেই,
চোখ শুকিয়ে গেছে, চোখে কোন জল নেই
কুশায়ার চাদরে আবৃত এই দিনে
আজ শানুর মন ভালাে নেই।

(সমাপ্ত)

ব্রেকিং নিউজ