বাংলার ফুটবলের সোনালি সময়ের ক্লাবগুলোর ইতিহাসপাঠের সময় : 6 মিনিট

আবির্ভাবঃ

বাংলাদেশের ফুটবল এর আবির্ভাব যদি বলতে হয় তাহলে প্রথমেই আসবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কথা ।তাদের বিলেতি নোঙর করেই এসেছিল ফুটবল এই দেশে আর জাহাজ থেকে নাবিকেরা নেমে খেলেছিল যে ফুটবল , তা-ই খেলতে যোগ দেওয়া কেল্লার সৈনিকেরা লোকমুখেই একপ্রকার ছড়িয়ে দেয় ফুটবলের নাম। এভাবেই উপমহাদেশে হয়ে যায় ফুটবলের পরিচয়। নাবিকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া সেই খেলা আবারো সাধারন মানুষ দেখতে পায় ইংরেজদের কাছে। ইংরেজরা দারিদ্রের সাথে একপ্রকার উপহার হিসেবেই যেন দিয়ে যায় এই কালজয়ী ফুটবলকে। কাগজে কলমে এর অস্তিত্ব না থাকলেও প্রথম এর প্রকাশ পাওয়া যায় এসপ্লানেড ময়দানে ১৮৫৪ সালের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। এই খেলায় কলকাতার রাজপুরুষদের সাথে ব্যারাকপুরের ইংরেজ সাহেবদের অংশ নেওয়ার নথি পাওয়া যায়। দুটির একটির নাম ছিলো ‘ক্যালকাটা অফ সিভিলিয়ানস’ আর অপরটি ‘জ্যান্টলম্যান অফ ব্যারাকপুর’। এরপর আবার এই খেলার দেখা পাওয়া যায় তখনকার সিপাহি বিপ্লবের পর।ইংরেজরা আবার তখন মনোযোগ দিতে থাকে এই খেলায়।তখনকার ব্রিটিশ শাসনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র কলকাতার বন্দরে ভিড়তো বড় বড় জাহাজ, আর এসব জাহাজের নাবিকদের সাথে কেল্লার সেনাদের ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা শুনতে পাওয়া যায়। এরপর তা ছরিয়ে পরতে থাকে সরকারি ও মিশনারি স্কুলগুলোতে।আর এভাবে একসময় শিক্ষিত বাঙ্গালিরা ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন।প্রেসিডেন্সি কলেজ ক্লাবে খেলা হত ফুটবল।তারপর ১৮৭৮ থেকে ১৮৯৪ এই ষোল বছরে বাংলার ফুটবল এগিয়ে গেল অনেকদূর। ১৮৯৫ থেকেই যাত্রা শুরু হলো নিয়মমাফিক উপমহাদেশের ফুটবলের। গর্বের বিষয় বাঙালিরাই এই আধুনিক উপমহাদেশের ফুটবলের পথিকৃৎ।

উপমহাদেশের ফুটবল ক্লাবের অতীতঃ

যদি প্রশ্ন করা হয় কোন ইংলিশ ফুটবল ক্লাব কোন ইংলিশ ফুটবল ক্লাবের ভা্রতবর্ষের মাটিতে প্রথম পরাজয় কোথায় এবং কখন? উত্তর হবে আমাদের এই ঢাকার মাটিতে, ঢাকা একাদশের কাছেই। ঘটনা আজ থেকে ৮০ বছর আগে ১৯৩৭ শালের ২১ নভেম্বের , প্রতিপক্ষ দল ইংল্যান্ডের ২য় বিভাগেীত আইলিংটন কোরিন্থিয়ান্স। এফসি পল্টন মাঠে ১-০ গোলে ঢাকা একাদশের কাছে কোন ইংলিশ ফুটবল দলের ভারতবর্ষের মাটিতে এটিই প্রথম পরাজয়।ইতিহাস ঘেটে জানা যায় ক্লাবটির শক্তি এতটাও কম ছিল না কারণ তারা লীগে আর্সেনাল,চেলসি,ফুলহামের মত দলগুলোর রিজার্ভ টিমের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত।যদিও ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ক্লাবটি হারিয়ে যায়।খেলায় একমাত্র গোলটি করেন পাখি সেন।

ওয়ারী ক্লাবঃ

আস্তে আস্তে কলকাতা থেকে ঢাকাতেও চলে আসে ফুটবল।বাংলার আনাচে কানাচে মানুষ খেলতে থাকে ফুটবল। দর্শক ও পছন্দ করতে থাকে খেলাটি। এক এলাকার দলের খেলা অন্য এলাকায় এভাবেই বাড়তে থাকে ফুটবলের চাহিদা। তাই ঢাকার কিছু বিত্তশালীদের চোখ ও পরে খেলাটির দিকে।তারাই মিলে চালু করেন ঢাকার প্রথম শ্রেণির ফুটবল। সেটি সাল ১৯১৫ তে। ১০-১১ টি দল প্রথমে খেলত ঢাকা বিভাগের লীগে।কলকাতাতেও খেলা হতে থাকে নিয়মিত। তখনকার আমলেই শুধু শহর নয় মহকুমা পর্যন্ত ফুটবল খেলার চল ছিল যা আজ আর দেখা যায় না। আর তখনকার একটি বিখ্যাত দলের নামই ওয়ারী ক্লাব।১৯১০ সালে ব্রিটিশ রাজপ্রাসাদ দলকে হারিয়ে তারা আলোচনায় আসে।আর তারপর তারা সুযোগ পায় কোলকাতা ফুটবল ক্লাবের সাথে খেলার।সেই আমলে ঢাকার এই ক্লাবটি শুধু ঢাকাতেই নয় কলকাতাতেও অনেক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

এই ক্লাবটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ধরা হয় তৎকালীন ক্রীড়াবিদ সুরেন্দ্রনাথ রায়কে। ওইসময়ের ওয়ালিংটন ক্লাবের কিছু ক্রীড়াপ্রেমিরা প্রতিষ্ঠা করেন এই ক্লাবটিকে যা পরবর্তিতে জন্ম দেয় অনেক সাফল্যমণ্ডিত খেলোয়ার।শুরুতে তাদের ছিলোনা কোন ঘর বা মাঠ। পরে ১৯৩০ সালে তারা খেলার সুযোগ পায় পল্টন ময়দানে, পায় দোচালা ঘর।১৯১৭ সালে সে সময়ের লীগ চ্যাম্পিয়ন ইংরেজ দল লিংকসকে হারিয়ে মনজয় করে কলকাতার দর্শকদের। এর পরের বছরই তারা হারায় কলকাতার অন্যতম শক্তিশালী দল মোহনবাগানকে। সে সময়ে মোহনবাগানকে হারানো খুব সহজ কথা ছিলো না। মোহনবাগানের সঙ্গে এই ক্লাব দুবার লড়েছে ১৯১৯ ও ১৯২৩ সালে। ফলাফল সমানে সমান, একবার জিত একবার হার।  ওয়ারীর এ লড়াইয়ের ভূয়সী প্রশংসা করে সে সময়ের ইংলিশ পত্রিকাগুলোও। উপমহাদেশ সফরকারী এই শেরউড ফরেস্টার ক্লাবের নেটে একমাত্র ওয়ারীই বল ঢোকাতে সক্ষম হয়েছিল। এই ওয়ারী কে যারা এই উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল তাদের কয়েকজনের কথা আমরা জানবো।

প্রথমেই আসে যতিন্দ্রনাথ রায়ের কথা । যাকে সবায় কানু রায় নামেই বেশি চিন্ত। অত্যন্ত ক্ষিপ্র এই রাইট আউট তার গতির জন্য বিখ্যাত ছিলেন।তার এই জনপ্রিয়তার কারনে পরে সুযোগ পান মোহোনবাগানে।তার সেরা শট ছিল রংধনু শট।পরে পুলিশে চাকরি করতেন,পান রায়বাহাদুর খেতাবও।১৯৬২ সালে মৃত্যু বরন করেন।

রাজেন সেনগুপ্ত।রাজেন নামে বেশি পরিচিত। সেন্টার হাফ পজিশানে খেলতেন।খাটো বেটে রাজেন হয়তো এখনকার মেসির সাথে তুলনা পেতেন। কিন্তু খেলা ছাড়াও ধারাভাষ্যকার হিসেবে তার নাম অনেক উপরে থাকবে। উপমহাদেশের ধারাভাষ্যকারের প্রচলন তিনিই জনপ্রিয় করে তুলেন।

আগের সেই ওয়ারী ক্লাব এখনো আছে ,নেই তার পুর্বের চাকচিক্য।কেনো ফুটবলের অধপতন সেটা অনেক বড় আলোচনার বিষয়।কিন্তু সে আলোচনা বাদ দিয়ে আমাদের ফুটবলের ইতিহাস জানার চেস্টা করা দরকার।তাতে আমরা বুঝতে পারব আমাদের আদিম ইতিহাস।আর বের করতে পারব আমাদের পিছিয়ে যাওয়ার এক নির্মম কাহিনী।

আবাহনী ক্লাবঃ

মুক্তিযুদ্ধের পরের বাংলাদেশের ফুটবলের কথা বলতে গেলেই ভেসে ওঠে বাংলার আকাশী নীল আবাহনীর কথা। মুক্তিযুদ্ধের পরের ১৯৭২ সালে শেখ মুজিব পুত্র শেখ কামালের তৈরি আবাহনী বাংলার ফুটবলকে দিয়েছিল এক আধুনিক ফুটবলের দেখা।তখনকার ইকবাল স্পর্টিং এর নাম বদলে আবাহনী রাখেন শেখ কামাল। শেখ কামাল আবাহনী সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলার ফুটবলের এর গণজাগরণ তৈরি করেন।

বাংলাদেশের সব বড় বড় খেলোয়ার খেলেছেন এই আবাহনীতে। ১৯৭২ থেকে ২০২০ আজও আবাহনী রাজ করে বাংলার ফুটবল। যদিও ধুল জমেছে তাদের তরবারিতেও। বাংলার তারকা ফুটবলার সালাউদ্দিন ছাড়াও প্রায় সব বড় তাড়কাই খেলেছেন আবাহনীতে। ১৯৭১ এর যুদ্ধের পর বাংলার শূন্য মাঠে তারাই ফিরিয়ে এনেছিল ফুটবলকে। বাংলার মাটিতে হওয়া সব কাপ ই ঘরে বহুবার তুলেছে  তারা।প্রিমিয়ার লীগ জিতেছে ৫ বার।১ বার হয়েছে রানারআপ।যার মধ্যে টানা ৩ বার এ শিরোপা ঘরে তোলে তারা।ঢাকা লীগ জিতেছে ১১ বার।যেখানে রানার-আপ হয়েছে ৭বার। এছাড়াও ফেডারেশন কাপ জিতেছে ১০ বার যেখানে রানার-আপ ৭বার। এশিয়া কাপ ১৯৮৫-তে রানার-আপ হয়েছিলো বাংলার ক্লাবটি।আবাহনীর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ বলা হয় মোহামেডানকে। একসময় দুইদলের ম্যাচ এর সময় দেশ দুইভাগ হয়ে যেতো। উত্তেজনা, খেলা সব ছিলো এই আবাহনী মোহামেডান এর ম্যাচে।এই বাংলার মাটিতে আবাহনিতে খেলে যাওয়া কতো নামকরা ফুটবলার এর নাম আজ কয়জন জানে ?     

শেখ কামালের ফুটবল হয়ত হতে পারত।কিন্তু বাংলার ফুটবল আজ এক খাদের কিনারায়।তাই ইতিহাস এ এখন আবাহনীর বেঁচে থাকার ভরসা।চলুন দেখা যাক আবাহনীর হয়ে মাঠ কাপিয়েছে কারা।১৯৮৬ সালে আবাহনীতে খেলা ২ জন বিশ্বকাপে খেলেছিল।এশিয়ার সেরা ডিফেন্ডার  ইরানি ফুটবলার সামির শাকিল আবাহনীতে খেলেছেন।শ্রীংলকার দুই কিংবদন্তী ফুটবলার প্রেমলাল এবং নিজাম পাকের আলি ও আবাহনীর হয়ে ঢাকার মাঠ কাপিয়েছিলেন।এছাড়াও ইরান এর অধিনায়কত্ব করা করিম মোহাম্মদ আলভীও ১৯৮৬তে আবাহনীর ছিলেন।১৯৮৬ সালের ঢাকা লীগকে বাংলাদেশের সেরা মৌসুম বলা হয়।

বাংলার ফুটবলে এখনো টিকে আছে আবাহনী।এখন তাদের রয়েছে আরো শক্ত কাঠামো।চাই আরেকটু পেশাদার হওয়া।আবাহনীর হাত ধরে আবারো ফিরে আশুক বাংলার ফুটবলের সোনালি সময় এ চাওয়া বাংলার প্রতিটি মানুষের।ধানমন্ডির এই মাঠ আবাহনীর সোনালি যুগের পরিচয়।শেখ কামালের আবাহনী ক্লাব আবার খেলবে তার প্রতিপক্ষ মোহামেডানের সাথে ,মাঠ ভরে যাবে দর্শকে, এই চাওয়াই সবার।

মোহামেডান ক্লাবঃ

আবাহনীর নাম এর সাথেই যেন জুড়ে আছে মোহামেডানের নাম।১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সনে বাংলার মাঠ তাদের ই ছিল। ১৯৩৬ সালে কলকাতা মোহামেডান এর হাত ধরে ঢাকার হাজারিবাগ এ চালু হয় ঢাকা মোহামেডান।১৯৪৭ সালে  এর দায়িত্ব নেন কলকাতা মোহামেডান এর তারকা মোহাম্মাদ শাহাজাহান।প্রথমে অনেক কষ্ট হলেও ধিরে ধিরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে তারা ১৯৮০-১৯৯০ কে মোহামেডান যুগ বলা হয়।সব শিরোপা আর ট্রেবল তাদের ই ছিল।

বাংলার তরুন সমাজ হয়ত বাংলার ট্রেবলের নাম শুনে হেসে উঠবে।কিন্তু বাংলারও একসময় দর্শকভরা মাঠ ছিল।হ্যাঁ বাংলার ও ট্রেবলের ঐতিহ্য ছিল।মোহামেডান -আবাহনী তে কেপে উঠত সারা দেশ।১৯৮০ সালে ফেডারেশন্স কাপে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়ে শুরু যে সাদাকালোদের, তারাই এক দশকে ঘরে তোলে ৭ টি ফেডারেশান্স কাপ।১৯৮১ সালের আবাহনির সাথে ফেডারেশান্স কাপের ফাইনাল এ  ২-০ এর জয়ের খেলাটি বাংলার মানুষের আজীবন মনে থাকবে।১৯৮২ তে সব কাপ এ জেতে সাদা কালোরা।পেয়েছিল আন্তর্জাতিক শিরোপাও। 

অনেকেই হয়ত জানে না ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ইরানি গোলকিপার নাসের হেজাজি খেলেছিলেন আমাদের মোহামেডানে।বাংলার ইতিহাসে তিনিই হয়ত খেলে যাওয়া সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকা।তিনি ১৯৮৬ মৌসুমে বাংলাদেশে খেলেছিলেন।

১৯৮৮ তে তাদের দুর্দশা শুরু হয়।১৯৯০ এ তো কোন কাপ ই জয় করতে পারে নি।যদিও পরে আবার ঘুরে দাড়ায় তারা।৯৩-৯৬-৯৯-০২ এ ঢাকা লীগ জেতে তারা।

কিন্তু আবাহনীর মত তাদের পথচলা একইরকম ছিল না। তাদের অতীতের সব অর্জন মিটে যায় তাদের টাকা সমস্যা ,দুর্বল অবকাঠামো, মেনেজমেন্ট এর কারণে।কিন্তু ১৯৮০-১৯৯০ এর মোহামেডান দর্শকের মনে গেঁথে থাকবে চিরদিন।

বাংলার সেই সোনালি ক্লাব গুলো আবার জেগে উঠবে।দর্শক ফিরে যাবে মাঠে।আবাহনি ,মোহামেডান দ্বৈরথ আবার দেখা যাবে। বাংলা আবার পাবে ফুটবলের সোনালি সময়ের দেখা।বিলেতি নোঙরে আশা সেই ফুটবল আবার আমাদের জাত চেনাবে ,সেই স্বপ্ন নিয়েই ঘুমায় বাংলার প্রতিটি মানুষ।

ব্রেকিং নিউজ