প্রাক্তনকেন্দ্রিক কথোপকথনপাঠের সময় : 6 মিনিট

লেখকঃ ইমতুল লোবান মতমি

তার সাথে আমার দুই বছরের সম্পর্ক ছিল। দুই বছর পর তার আর আমার সম্পর্কটা ভেঙে গেল। আলাদা হয়ে গেলাম দুজন। আলাদা দুই পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে গেলাম আমরা। আমি শহরে আর তুমি গ্রামে থাকো। আমার জীবন যাত্রায় অনেক পরিবর্তন এসেছিল। শহুরে বাতাসে নিজেকে পরিবর্তন করাটা ছিল পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে তােলা বৈ আর কিছু নয়। তাই একটু পরিবর্তন এসেছিল আমার মধ্যে। এদিকে তুমি যে গ্রামে থেকে যেমন আছাে তেমনই রবে এই মর্মে আমার যে ধারনাটা ছিল,তা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে তুমি যে কলেজে যাবে এটা আমি ভাবিনি। না ভাবার-ই কথা। কারণ,আমাদের এই অঞ্চলে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের স্কুল পাশ করার পর বিয়ের জন্য পরিবার উঠে পরে লাগে। তােমার ক্ষেত্রেও আমি এরূপ কল্পনা করেছিলাম। আর আমি শহরে যাবার পরপরই তুমি আমাকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিলে। তাই আমার বুঝতে আর বাকি রইলাে না যে আর চার পাঁচটা মেয়ের মত হয়তাে তােমারও বিয়ে হয়ে যাবে। তাই এই ভাবনাটা একটু বেশী ভেবে তােমাকে আমি ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও করেছিলাম। আর সেই তুমি স্কুল পাশ করে যে এত বড় হয়ে যাবে তা আমি ভাবিনি। পরিবারের সিদ্ধান্তকে অমান্য করে তুমি জেলা শহরের কলেজে ভর্তি হলে। তাই তুমি নিজেও অনেক বদলে গিয়েছিলে। ভালাে-খারাপের সাথে মিশে অনেক অজানা কিছু সম্পর্কে তােমার ভালাে জ্ঞান হয়েছিল। একদা আমি ছুটিতে বাসায় এসে তার সাথে যােগাযােগ করি। সে আমাকে বললাে তার সাথে দেখা করতে।আমি আগ-পিছ না ভেবে রাজি হয়ে গেলাম। পরিপারটি হয়ে পরদিন গেলাম তার সাথে দেখা করতে তার কলেজে। আমি তাকে দেখে সত্যি বিমােহিত হয়ে গেলাম। সে এত সুন্দর হল কীভাবে? রূপে এত জৌলস আসলাে কোথা থেকে? আগে তাে এমন ছিল না সে? মনে মনে প্রশ্ন করলাম নিজেকে।

তার সাথে ভালাে-মন্দের খােজ নেয়ার পর আকস্মাৎ প্রশ্ন করলাম, তােমার এত পরিবর্তন হল কীভাবে?

জবাবে সে মুচকি হাসে বললাে-কী ভেবেছাে?শুধু নিজে শহরে গিয়ে বদলাবে,আর আমি তােমার এই বদলানােটা দেখে ক্ষান্ত রবাে? আমিও বদলে গেছি এই মফস্বলের বাতাসে। আমি জানি,তুমি কেন আমাকে ত্যাগ করেছে।

আমি কারণটা জানতে চাইলাম। কারণ ত্যাগ করার কারণটা আমার চেয়ে ভালাে আর কেউ জানে না।তাই জিজ্ঞাসা করে জানতে চাইলাম ।

সে জবাবে বললাে-তুমি আমাকে বলতে চট্টগ্রামের মেয়েদের মত স্মার্ট হতে,তাদের মত করে কথা বলতে। আমি তখন তা করতে পারিনি।আর সেজন্য তুমি আমাকে অবহেলা করে দূরে ঠেলে দিলে। কিন্তু এখন আমি আর আগের মত নেই নিজের পরিবর্তন ঘটিয়েছি। তােমার মনের মত হয়েছি। সুন্দর কথা বলার,নিজেকে সুন্দর করে
উপস্থাপন করার গুণ এখন আমার আছে।

তার এসব কথা শুনে আমি নিভৃত রইলাম। মনে মনে বললাম কারণতাে আরেকটা ছিল সেটা কেন বলছাে না
সােনা?

বিয়ের জন্য যে চাপ দিত সে আমাকে,এটা ছিল তাকে ত্যাগ করার প্রধান কারণ। যাই হােক আমি সে সময় কোন কথা বলিনি।তার কথা শুনে ক্ষান্ত রইলাম। এক পর্যায়ে প্রশ্ন করলাম-বিয়ের জন্য বাড়ি থেকে চাপ দেয় না?

সে বললাে-দেয়,কিন্তু আমি এই মূহুর্তে বিয়ে করবাে না। লেখাপড়া শেষ করি তখন বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবাে।তার কথা শুণে আমি ধুম মুভির আলীর মত অনেক সুদূরপ্রসরী চিন্তা করে ফেলেছিলাম। সেই মূহুর্তে সামনাসামনি একটা কথা বলবাে বলবাে করে বলার দুঃসাহস হয়নি। তাই সাক্ষাৎ পর্ব শেষ করে বাড়ি চলে আসলাম।

বাড়িতে এসে সামাজিক যােগাযােগ মাধ্যমের মাধ্যমে “তার জীবনে পুনরায় ফিরতে চাচ্ছি” এই সংক্রান্ত একটি বার্তা পাঠালাম। ফিরতি বার্তায় সে আমায় জানালাে-তার একটা ছেলে বন্ধু আছে। যে তাকে অনেক ভালবাসে,যে সবসময় তার যত্ন নেয়,যে যেকোন সময় তাকে বিয়ে করতে প্রস্তুত এছাড়া আরা অনেক কিছু! আমি তার কথায়
খুব বৃহৎ মাপের আঘাত পেলাম। আমি কখনাে ভাবিনি সে নতুন করে নতুন কারাে সাথে আবার নতুন করে জড়াবে।আমি অবিশ্বাস করে বললাম-ফাজলামু করাে না,আমি সিরিয়াস তােমার জীবনে পুনরায় ফেরার ব্যাপারে।সে কিছু না বলে তার আর তার ছেলে বন্ধুর একান্ত ঘনিষ্ঠ অবস্থায় তােলা একটি ছবি পাঠালাে। যা দেখে আমার সমন্ত অবিশ্বাস,সন্দেহ দূর হল।আমি তাদের শুভ কামনা জানিয়ে বিদায় নিলাম।

যােগাযােগহীন ভাবে কাটলাে দেড়টি বছর। এর মধ্যে আমি চাইলে যােগাযােগ করতে পারতাম কিন্তু কোন মুখে আমি তার সাথে যােগাযােগ করবাে?

একে তাে তার ছেলে বন্ধু আছে, দ্বিতীয়ত ত্যাগ করার সময় তাকে আমি অনেক কটু কথা বলেছিলাম। যা ত্যাগ করার পরে এত গুরুত্ব দেইনি কিন্তু এখন দিতে হচ্ছে। তাই এসব ভেবে আর যােগাযােগ করিনি।


ফেব্রুয়ারি মাসের ১৫ তারিখ, শুক্রবার ছিল। জুমা’র নামাজ পরে বাসায় এসে হাতে মােবাইল নিয়ে দেখলাম অচেনা একটা নাম্বার থেকে বার্তা এসেছে।

বার্তায় লেখা-” আগামী মাসের ৩রা মার্চ আমার বিয়ে । তােমার নিমন্ত্রণ রইলোইতি-তােমার প্রাক্তন

আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম তৎক্ষণাত তাকে কল দিলাম,সত্যতা যাচাইয়ের জন্য। সে আমায় জানালাে সবই সত্য।আর তার সেই ছেলে বন্ধুর সাথেই নাকি তার বিয়ে। বাগদান সম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি।খবরটা শুনে কিঞ্চিত খারাপ লাগলেও,সর্বোপরি ভালাে লেগেছে। কারণ প্রথম ভালােবাসার মানুষ হিসেবে আমাকে
না পেলেও দ্বিতীয় ভালবাসাকে সে নিজের করে পাবে। বিয়ের আগে আমি তার সাথে একবার দেখা করতে চাইলাম। সে দেখা করতে সম্মতি জানালাে এবং পরদিনই সে দেখা করতে চাচ্ছে।আমি না করলাম না।তার নির্বাচন করা দিনে,তার পছন্দ করা একটা স্থানে আমরা আবার দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। শহরে দুজন একত্রিত হয়ে তারপর দুজনে ওই স্থানে যাবাে এই মর্মে অঙ্গিকারবদ্ধ হলাম এবং তাই হল। শনিবার সকালে দুজন একত্রিত
হয়ে ওই স্থানে যাওয়ার জন্য রওনা হলাম। যাত্রাপথে আমাদের খুন শুটি হল। সাপের মিলনের মত আমাদের হাতের মিলন হল। অবশেষে ঐ স্থানে পৌছলাম। তাকে আমি আমার বাম পাশে বসতে বললাম। কারণ হৃদপিন্ডটা বাম পাশে। তাই সমস্ত নারীকে সর্বদা বামপাশে রাখি। সে হঠাৎ আমার কাধে মাথা রেখে অঝড়ে কাঁদতে শুরু করলাে। বার বার থামানাের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। কয়েক মূহূর্ত আগ পর্যন্ত সে স্বাভাবিক ছিল। হঠাৎ কান্না শুরু করলাে। আমি কারণটা বুজতে পারলাম। তাই আর থামানাের ব্যর্থ চেষ্টা করলাম না। তার চোখ নিঃসৃত পানি তার গাল বেয়ে আমার বুক পকেটে জমা হচ্ছে। পাশে বসা আমি তার বাহুতে ধরে তাকে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করলাম।আমিও কাঁদতে চেষ্টা করলাম। কণ্ঠ যদিও ভিজেছে,চোখ দুটো শুষ্কই রয়ে গেল। আমার ভেজা কণ্ঠ শুনে সে বুঝতে পারলাে আমি মনে মনে কান্না করছি। তাই সে নিজে কান্নার টপিক বদলে অন্যদিকে মন দিলাে। অনেকটা সময় তার সাথে ওই স্থানে অতিবাহিত করে সন্ধায় ঘরে ফিরলাম। ঘরে ফিরে তার কথা বড্ড মনে হতে লাগলাে।চোখ দিয়েও পানি ঝড়তে লাগল। আমার কান্নাতে মৃদু একটা আওয়াজ হতাে। সেই আওয়াজকে অন্য কারাে শ্রবণ অযােগ্য করার জন্য বালিশের সাহায্য নিলাম। বালিশ মুখে চেপে কান্না করলাম। বালিশ ভিজে একাকার। টানা কয়েকদিন কান্না করা অবিরাম চলতে থাকলাে। কান্না করার সময়ে কিছু ছবিও তুলেছি। সেই ছবিগুলাে গুগল ড্রাইভে সংরক্ষণ করেছিলাম কিন্তু একটা দুষ্ট মেয়ে সেই ছবিগুলাে ডিলেট করে ফেলেছে। এই দুষ্ট মেয়ে কে? সেটা এখন জানতে চাইবেন না দয়া করে। পরবর্তী হয়তাে তাকে নিয়ে অন্য গল্প আসতে পারে। তাই ধৈর্য ধারণ করুন।

আমি আমার প্রাক্তনকে আপন করে পেতে চেয়েছিলাম। সেজন্য কৌশলে আমার মাকে ব্যাপারটা জানালাম।মা এই কথা শােনা মাত্রই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। মায়ের চোখ রাঙানী দেখে আমার বড্ড ভয় হল। আমি কান মুলে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে ভালােয় ভালােয় পাশ কাটিয়ে ভদ্র ছেলের মত স্থান ত্যাগ করলাম। এভাবে দেখতে দেখতে তার বিয়ের দিন ঘনিয়ে এল। তার বিয়ে হয়ে গেল। আমি বিয়ের দিন হাউমাউ করে কাঁদলাম। অনেক দিন
আগে আমার কাছের এক আত্নীয় মারা গিয়েছিল। তিনার মৃত্যুতে আমি অনেক শােকগ্রস্থ ছিলাম ।তাই অনেক কেঁদেছিলাম।আর তার কয়েকদিন পর চিন্তা করেছিলাম তিনার মৃত্যুতে আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি। তাই হয়তাে এভাবে কেঁদেছি। বিচ্ছেদের কষ্টটা বুঝি এমনই হয় এটা ভেবেছিলাম কিন্তু তার বিয়েরদিন তার বিচ্ছেদের কষ্ট তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলাে।

সেদিন ডায়েরীতে লিখেছিলাম “আপন জনের মৃত্যু হলে খুব কষ্ট লাগে,ধীরে ধীরে সেই কষ্ট ক্ৰমশ হ্রাস পেতে থাকে। এক সময় আর কোন কষ্টই লাগে না। কিন্তু প্রিয়জন যদি বেঁচে থেকে দূরে সরে যায়,এই কষ্ট ক্রমশ দিনক্রমে বৃদ্ধি পায়।

যার বাস্তব উদাহরণ আমি নিজেই। তার বিবাহ কার্য সম্পন্ন হয়ে গেল। বিয়ের আগে তার নিকট আমার একটা চাওয়া ছিল,সেটা হল বধূ বেশে তার কয়েকটা ছবি যেন সে আমাকে দেয়। আমার কথা সে রাখলাে। টুকটুকে লাল শাড়ী পড়া তার বধূসাজের কয়েকটা ছবি আমার কাছে আসলাে। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারলাম না। শুরু হল অশ্রু বৃষ্টি, শুরু হল বুকে রক্তক্ষরণ। নিজেকে সংবরণ করতে চেষ্টা করলাম। তাকে ভুলতে চেষ্টা
করলাম। ওই দুষ্ট মেয়েটার সাথে আমার রসায়ন জমাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমি যে আমার রসায়নের সকল নােট প্রাক্তনের কাছে রেখে এসেছি।

( চলবে… )

ব্রেকিং নিউজ