পর্ব-৭ঃ আজ শানুর মন ভালো নেই – ” মা…মমতা…মাতৃত্ব “পাঠের সময় : 6 মিনিট

লেখকঃ মোঃ মতিউল্লাহ

আসাদের কথায় সকলে নরম হয়ে হয়ে গেল। তারা আনিসের বিয়ের ব্যাপারে মনােযােগী হল। মামা তার হাতে থাকা পাত্রীদের দেখালেন। আসাদের বাবা ধনী ঘরের অসুন্দর এক মেয়েকে পছন্দ করলাে। তার নাম বিথী। মােটা অঙ্কের টাকা যৌতুকের বিনিময়ে বিবাহ হল, আনিসের বিয়েতে আনিসের বাবা খুশি হলেও আনিস খুশি হতে পারলাে না। ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করানাে, ক্রসফায়ারের মুখােমুখি করার সমান। তাই আনিস খুশি হতে পারলাে না।

এদিকে আসাদ আর শানুর বিয়ের সাত বছর হয়ে গেছে। তাদের ঘর আলাে করার মত কেউ আসেনি। তারা নিঃসন্তান রয়ে গেল। মা-বাবার অশান্তির যন্ত্রণায় আসাদ পরিবার থেকে পৃথক হয়ে গেল। সে পৃথক হতে চায়নি। কিন্তু পরিস্থিতি তাকে পৃথক করতে বাধ্য করেছে। সারা দিন শানুকে খােটা দিয়ে কথা বলে। শানুর দুঃখে জর্জরিত মনটাকে বারে বারে আঘাত করে ভেঙে চুরমার করে দেয়। শানুর সাথেএরূপ আচরণ না করার জন্য আসাদ মা-বাবার কাছে হাত জোর করে অনুরােধ করেছে। কিন্তু কেউ তার অনুরােধ রাখেনি। তার ভালবাসার মানুষটাকে নিত্যদিন এরূপ বৈরি পরিস্থিতির মুখােমুখি হতে হচ্ছে বলে সে এবারে কঠোর হলাে। তার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এবার তাকে ঘুরে দাড়াতেই হবে। তাই সে নিজে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে গেল।

আসাদ কাজে থাকলে শানু একা ঘরে দরজায় খিল আটকে দক্ষিণের জানালাটা খুলে, জানালার শিকে ধরে প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকে।

দক্ষিণা বাতাস তাকে দোলা দেয়। সে আনমনে হয়ে যায়। আনমনা হয়ে সে কল্পনার জগতে চলে যায়। সে শাহাদ কে দেখতে পেল। ছােট বেলায় শাহাদকে যেভাবে ভালবাসা,আদর ,যত্ন করে লালন পালন করেছে তার সব কিছু তার চোখের সামনে স্পষ্ট ভাসতে লাগলাে। শানু স্কুল থেকে এসে স্কুলের ড্রেস না ছেড়েই মায়ের কোল থেকে শাহাদকে ছিনিয়ে নিয়েছে। মা বললাে কাপড় বদলে খেয়ে নে শানু ।আমি পরে খাবাে মা… শাহাদকে নিয়ে সে খেলা করতে লাগলাে। সে শাহাদের পেটে শুরসুরি দিচ্ছে। শাহাদ খিলখিল করে হাসছে। হাসির মাত্রটা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে সে শুরসুরি দেয়া বন্ধ করে শাহাদকে বুকে জড়িয়ে চুম্বন করলাে। বােনের বুকে সে প্রশান্তি পায়। বুকে জড়াতেই সে চুপটি করে থাকে। সে আরাে দেখলাে সে শাহাদকে গােসল করিয়ে দিচ্ছে। আলতাে করে তার সারা গায়ে সাবান মেখে দিচ্ছে। গােসলের পর শানু তার ওড়না দিয়ে শাহাদের পুরাে শরীর মুছে তেল মেখে দিচ্ছে। মা…ওমা…আমার খুদা লেগেছে,খেতে দাও। শানুর আচল টেনে কেউ বললাে সে এরূপ অনুভব করলাে।দাড়া বাবা,দিচ্ছি।কোন দিকে দৃষ্টি না দিয়ে সে দৌড়ে একটা বাটিতে করে ভাত নিয়ে আসলাে। কার জন্য সে খাবার নিয়ে এসেছে? ঘর যে শূন্য। খাবার সহ বাটিটা হাত থেকে পড়ে গেল। সে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে শুরু করলাে। সে আল্লাহর নিকট আকুতি মিনতি করে একটা সন্তান চাইলাে। মসজিদ,মাদরাসায় দান করার মানত করলাে। ফকির-মিসকিন খাওয়ানাের মানত করলাে। কাদতে কাদতে এক পর্যায়ে সে বেহুশ হয়ে ঘরের মেঝে পড়ে থাকে। আসাদ কাজ থেকে ফিরে বার বার দরজায় কড়া নাড়তে থাকে। দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজে তার হুশ আসে। সে দরজা খুললে আসাদ ঘরে প্রবেশ করে। শানুকে দেখে আসাদ চমকে গিয়ে বলে-চেহারার একি অবস্থা করেছে কেঁদে?

কই কেঁদেছি? আমিতাে ঘুমিয়েছি।

হয়েছে মিথ্যা বলতে হবে না। এমন করাে কেন তুমি? আমরাতাে সুখেই আছি। নিঃসন্তান থেকে কতশত মানুষ জীবন পার করে দিচ্ছে। আমরা কেন পারবাে না? আমরাও পারবাে। তুমি একটু শক্ত হও।

আমি যে আর পারছি না গাে। সারাদিন ঘরে একা থাকি। ঘরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। মনের অজান্তেই আমি কেঁদে ফেলি।

তুমি কিছুদিনের জন্য বাপের বাড়ি থেকে ঘুরে আসাে।

না,বাপের বাড়ি যাবাে না।

কেন?

মানুষের কটু কথা শুনতে আর ভালাে লাগে না। তাই বাপের বাড়ি গিয়ে সেই কটু কথার পাল্লা ভারি করতে চাই না।

যা ভালাে মনে করাে। এখন খাবার দাও, খিদে পেয়েছে।

আসাদ হাত মুখ ধুতে চলে গেল। শানুআবার অনুভব করলাে তার আচল টেনে কেউ বলছে মা…ওমা…খিদে পেয়েছে খেতে দাও। সে খাবার এনে পরিবেশন করলাে। আসাদ তার বিপরীতে বসলাে। দুই থালায় দুজনের জন্য ভাত বাড়লাে। ছােট একটা বাটিতে সে কিছু ভাত এবং তরকারি রাখলাে। আসাদ তাকে প্রশ্ন করলাে-বাটিতে ভাত রাখলে কেন?

ও তুমি বুঝবে না।

বুঝিয়ে বলাে,তবেই তাে বুঝবাে।

এটা আমাদের খােকার জন্য। সে আমার আঁচল টেনে বলেছে তার নাকি খিদে পেয়েছে। তাই তাকে বাটিতে ভাত বেড়ে দিয়েছি।

আসাদ তার পাগলামি দেখে হাসলাে। ভালােবাসার মানুষের সবই ভালােলাগে। আসাদ শানুকে প্রচন্ড ভালােবাসে।আর সেজন্যই তার সকল কর্মকান্ড তার ভালাে লাগে। খাওয়া শেষ করে দুজন গল্প করে পুরাে বিকাল কাটিয়ে দিল। এদিকে আনিসের পরিবারে সুখ নেই। বউয়ের সাথে তার ঝামেলা লেগেই থাকে কিন্তু আনিস তার মা-বাবার জন্য সকল সমস্যা চুকিয়ে নেয়। পরে দুইদিন সব ঠিকঠাক চলে। তারপর আবার শুরু। মা-বাবার কারণে টিকে আছে আনিসের সংসার। তার বউ ধনী বাবার একমাত্র মেয়ে। জমির ধান,গম,আখ ঘরে উঠার সাথে সাথে আর পুকুরের মাছ ধরা মাত্রই বিখীর বাবা বেয়াই বাড়ি নিয়ে আসে। তাই আনিসের লােভী বাবা অনেক খুশি। সারাদিন ছােট বউয়ের প্রসংশা করে। মা তাকে মাথায় তুলে রাখে। আনিস বউকে কিছু বললে মা-বাবা তাকে অনেক বকা ঝকা করে। এসব অশান্তি থেকে বাঁচতে আনিস প্রায়শই বাড়ি থেকে রাগ করে বের হয়ে যায়। রাগ কমলে সে আবার বাড়ি আসে। হঠাৎআনিস জানতে পারলাে তার বউ সন্তান সম্ভবা। সাত মাসের পােয়াতী। তাই আনিস বউয়ের প্রতি মনােযােগী হল,সংসারী হল। মা-বাবার কদর বেড়ে গেল তাদের দুজনের প্রতি। আনিসের বউয়ের খাতির যত্নের কোন কমতি নেই। কোন কাজ করতে হয় না তার শ্বাশুড়ি খাবারটা পর্যন্ত তার মুখে তুলে দেয়। রাজ-রাণীর মত করে দিন কাটাতে লাগল বিথী। শানু এসব দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। আর নিরবে নিভৃতে কাঁদে। এই সংসারে সে কি পেয়েছে? আর তার জা কি পাচ্ছে? তার তুলনা করলাে সে। সব দিক থেকে সে ঠকলেও, একদিক থেকে সে জিতে আছে। সেটা হল তার স্বামীর নিঃস্বার্থ ভালােবাসা। সাত বছর সংসার জীবনে তার সাথে আসাদের কোন ঝগড়া বিবাধ হয়নি।আর আনিসের ঘরে এটা লেগেই থাকে। তাই শানু এই দিয়ে নিজের মনকে সান্তনা দিলাে কিন্তু বিথী সন্তানসম্ভবা, কদিন পরেই তাদের ঘরে নবজাতক আসবে। একথা ভাবতেই শানুর গা শিউরে উঠলাে। সে ঘরের খিল বন্ধ করে কাঁদতে কাঁদতে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল। তাই সিলিং এর তাল কাঠে সে শাড়ি বাঁধল। বিছানার অগ্রপ্রান্তে দাড়িয়ে সে মালা তৈরী করে গলায় পড়লাে। দক্ষিণ দিকের জানালায় চোখ পড়তেই সে কি যেন ভাবলাে। গলা থেকে মালা সরিয়ে নিয়ে জানালা পাশে গিয়ে জানালা খুলে দাড়ালাে। দক্ষিণা বাতাস তার কাপড়, চুলে দোলা দিয়ে তার ঘরে প্রবেশ করলাে। সে প্রশান্তি অনুভব করল। তার মনটা দোলে উঠলাে। সে আনমনে হয়ে গেল। সে অনুভব করলাে তার ঘরে দুইটা বাচ্চা শিশু দৌড়ে দৌড়ে খেলা করছে।

সামনের শিশুটি পিছনের শিশুকে বলছে-পারবে না,আমাকে ধরতে পারবে না। হা…হা…হা… শানু বাচ্চাদের কোলাহল শুনে জানালার বিপরীতে তাকিয়ে সব দেখলাে। সব তার চোখে স্পষ্ট লাগছে। সে তাদের খেলা উপভােগ করছে। সে মন খুলে হাসছে। অনেকক্ষণ দৌড়ে বাচ্চা দুটো ক্লান্ত হয়ে গেল। সে হাঁটুগেড়ে দুই হাত প্রসারিত করে তাদের কোলে আসার আহবান করলাে- আয় বাবা আয়,আমার বুকে আয়।

বাচ্চারা দৌড়ে তার বুকে আসলাে। সে চোখ বন্ধ করে তাদের মাথা তার দুই কাধে ফেলে আদর করল এবং তাদের গায়ের গন্ধ শুঁকল। আজ শানুর মাতৃত্বের স্বাদ যেন পূর্ণতা পেল।

সন্তানকে বুকে জড়ালে যে কতটা সুখ পাওয়া যায় সে তা উপভােগ করলেন। হঠাৎ দরজায় কেউ কড়া নাড়লাে। তার সব ঘাের ধুলিসাৎ হয়ে গেল। সিলিং এ ফাঁস নেয়ার শাড়ী ঝুলছে। তাড়াতাড়ি সে সিলিং থেকে শাড়ি নামিয়ে দরজা খুললাে। আসাদ এসেছে। আজ সে তাকে সময় দেয়ার জন্য একটু আগে আগেই বাড়ি ফিরেছে। একসাথে খাবার খেয়ে খােশ গল্প করে পুরাে বিকাল কাটিয়ে দিল।

রাতে আনিসের বউয়ের প্রসব বেদনা উঠেছে। সে চিৎকার করছে। শানু ঘরে থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে বের হলাে। আসাদ তাকে দেখে আসতে বলল, বিথীর প্রসবের সময় হয়েছে।

আসাদ ঘরে রইল এবং শানুকে পাঠাল খরব নিয়ে আসতে। শানু আনিসের ঘরে প্রবেশ করলো। দেখলাে
আনিসের বউ বিছানায় শােয়া আর তার শাশুড়ি ও এলাকার এক ধাত্রী তার পাশে বসা।

শাশুড়ি শানুকে দেখে বিস্মিত হয়ে বললাে-তুমি এখানে কেন এসেছাে?

বিথীর চিৎকারের শব্দ পেলাম। তাই দেখতে আসলাম।

এখন দেখেছাে কেন চিৎকার করছে?

হুম দেখেছি।

তবে বিদায় হও।

মন খারাপ হয়ে গেল তার। সে দরজার বাহিরে পা রাখতেই শুনলাে-অপয়া,অলুক্ষণে মেয়ে কোথাকার।

তার শাশুড়ি এই কথা বলেছে। কথাটা তার মনে ধনুকের তীরের মত বিঁধল।

( চলবে… )

ব্রেকিং নিউজ