পর্ব-৬ঃ আজ শানুর মন ভালো নেই – “কুসংস্কার”পাঠের সময় : 6 মিনিট

লেখকঃ মোঃ মতিউল্লাহ

আসাদ এবার চিন্তা করলাে ডাক্তার পরিবর্তন করবে। এতদিন যে ডাক্তার দেখিয়েছে তার কাছে আর যাবে না। তাই অন্য ডাক্তারের খােজ করতে লাগলেন।

হঠাৎই নাহারের বিয়ে হয়ে গেল। নাহারের শ্বশুরবাড়িতে আসাদ বেড়াতে গেলে নাহারের ভাসুর তাদের এই সমস্যার কথা শুনলেন এবং তিনি আসাদকে এক ডাক্তারের খােজ দেন। এই ডাক্তারের কাছে নাহারের ভাসুর চিকিৎসা নিয়ে দাম্পত্য জীবনের চার বছর পর বাবা হতে সক্ষম হন। অন্ধাকারের মধ্যে আশার আলাে খুজে পেলেন আসাদ। তাই এই ডাক্তারের শরনাপন্ন হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা পূর্বের সকল ব্যবস্থাপত্র,পরীক্ষার রিপাের্ট সমেত ডাক্তারের চেম্বারে উপস্থিত হলো।

ডাক্তারতাদের সকল রিপাের্ট দেখে তাদের বললেন- সমস্যা কিন্তু কারাে একার না। সমস্যা আপনাদের দুজনেরই রয়েছে।

নতুন করে তাদের দুজনকে আবার পরীক্ষা করে ডাক্তার ঔষুধ দিলেন। পূর্বের ন্যায় ঔষুধ শেষ করে তারা আবার ডাক্তারের শরনাপন্ন হলেন। ডাক্তার তাদের এমন দুঃসংবাদ দিবে তারা তা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি।আসাদের স্পার্মে ঘাটতি রয়েছে। আর শানুর জন্মগতভাবে জরায়ুর ভিতরের গঠনে সমস্যা থাকার কারণে সে ভ্রণ ধারণ করতে পারে না। তাই ডাক্তার তাদের নিরাশ করে দিয়ে বললেন আর টাকা নষ্ট করে লাভ নেই। আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করুন। আল্লাহ্ সব পারে। শানু একথা শুনে চেম্বারেই কেদে দিল। আসাদ তাকে শান্ত করে চেম্বার থেকে বের হলাে।

“ডাক্তারের পিছনে যত টাকা খরচ করেছে, ঐ টাকা দিয়ে বাড়িতে একট ঘর এবং আসাদকে আরেকটা বিয়ে করানাে যেত। তা না করে বন্ধ্যা একটা মেয়ের পিছনে হাজার হাজার টাকা নষ্ট করছে। কি দিয়েছে শানুর বাপ আসাদকে? কিছুই দেয়নি। তাও ছেলেটা এই অপয়া মেয়েটাকে আকড়ে ধরে আছে। আজ আসুক, আসাদ বাড়িতে। এর একটা না একটা বিহিত করেই ছাড়ব।”

এসব কথা আসাদের মা-বাবা বাড়িতে বলাবলি করলেন।

আসাদ স্ত্রীসহ বাড়িতে আসার পরেই তার বাবা চেচামিচি শুরু করলাে। সে সব শুনে বাবার কাছে নতজানু হয়ে কী হয়েছে জানতে চাইলাে।

বাবা উগ্র কণ্ঠে বললেন, কষ্টে অর্জিত টাকাণগুলাে বৃথা ব্যায় করতে তর খুব ভালাে লাগে,তাই না?

না,ভালাে লাগে না। (আসাদ)

তবে একটা অপয়া,বন্ধ্যা মেয়ের পিছনে টাকাগুলাে নষ্ট করছিস কেন? (আসাদের বাবা)

আসাদের খুব রাগ হলাে। সে মাটির দিকে তাকিয়ে নিজের রাগকে সংবরণ করতে চাইল। খানিকক্ষণ পরে সে মাথাউচু করে বললাে- শানু আমার বউ,সে অপয়া না! বাবা সে লক্ষী,ঘরের লক্ষী। তুমি তাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে কথা বলতে পারাে না বাবা।

লক্ষী,হা হা হা! তর বউ লক্ষী? শােন তর মামাকে খবর পাঠিয়েছি। সে আসলে তর জন্য মেয়ে দেখতে যাবাে। আবার তােকে বিয়ে করাবাে। (আসাদের বাবা)

ইতিমধ্যে আসাদের মা এসে বাবার পাশে দাড়ালেন এবং বাবার সুরে সুর মিলিয়ে বললেল , শানুকে তালাক দিবি না তাকে রেখেই আরেক বিয়ে করবি? এই সিদ্ধান্ত নে এখন। আমাদের বয়স হয়েছে। কখন জানি মরে যাই? নাতি-নাতনীর মুখ দেখতে বড় ইচ্ছে করে আমাদের। তাই তুই বরং শানুকে তালাক দিয়ে আরেকটা বিয়ে কর বাবা।

দুঃখের মধ্যে হেসে উঠলাে আসাদ এবং বললাে- আমার সিদ্ধান্ত দেখি তুমিই নিয়ে ফেলেছে। শােন মা! জন্ম,মৃত্যু এবং বিয়ে এইগুলো বিধাতার লেখন। মানুষের জন্ম একবার মৃত্যুও একবার তবে বিয়ে কেন বহুবার?

মা চুপ রইলো। বাবা বলে উঠলাে- সন্তান না হলে বহুবার করতে হয়। শুনিস নি? আমাদের এলাকার জমিদারের কথা! তিনি তো তিন বিয়ে করেছিলেন। প্রথম দুই বউয়ের বাচ্চা হতাে না। তাই তৃতীয় বিয়ে করেছিলেন এবং বাচ্চাও হয়েছিল।

আসাদ এই ইতিহাস জানে। আর এও জানে যে,বাচ্চা জমিদারের না। জমিদার অন্যের সুন্দরী বউকে পছন্দ করে গায়ের জোরে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের সাত মাসের মাথায় জমিদারের বউ সুস্থ একটা ছেলে জন্ম দেয়। যা কোন ভাবেই জমিদারের সন্তান হতে পারে না। আর ওই জমিদারের পরে আর কোন সন্তান হয়নি। এসব কথা তার বাবাও জানে। কিন্তু এখন আসাদকে বিয়ে করানাের জন্য এসব উদাহরণ তার সামনে তুলে ধরছে। তাই এসব নিয়ে সে তার বাবার সাথে তর্ক করবে না। সে ঠান্ডা মাথায় তার বাবাকে বললাে-আচ্ছা বাবা,তুমি কি জমিদার?

না,আমি জমিদার হতে যাবাে কোন দুঃখে। (আসাদের বাবা)

মনে করাে তােমার ইচ্ছে জমিদার হওয়া। কিন্তু তুমি তােমার জীবনে তা হতে পারলে না। তখন কি তুমি ইচ্ছা করে মরে গিয়ে পুনরায় নতুন করে জন্ম নিয়ে, জমিদার হয়ে তােমার ইচ্ছাটা পূরণ করতে পারবে?

এসব কোন ধরণের কথা? (আসাদের বাবা)

কথা যে ধরণেরই হােক,আমি উত্তর চাচ্ছি।

জন্ম একবার ,মৃত্যু একবার। তাই মরে গিয়ে জন্ম নেয় কোন ভাবেই সম্ভব না। (আসাদের বাবা)

আচ্ছা মানলাম তােমার কথা। এখন বলাে,তুমি জমিদার হতে চাও। কিন্তু তােমার কাছে অর্থ-সম্পদ নেই। তুমি জমিদার হতে পারলে না। এখন কি এই শােকে তুমি মরে যাবে?

না,মরার প্রশ্নেই আসে না। (আসাদের বাবা)

কেন?

মানুষের জীবনে তার কিছু ইচ্ছা অপূর্ণ থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। (আসাদের বাবা)

ঠিক সেইরকম আমার আর শানুর অবস্থা। আমাদের দুজনেরই একটা ইচ্ছা আছে। আমরা দুজনেই একটা সন্তান চাই কিন্তু আমাদের কোন সামর্থ নেই। আমরা দুজনেই আমাদের দৈহিক অক্ষমতার কারণে তা পারছি না। এখন কি আমি শানুকে তালাক দিয়ে বা তালাক না দিয়েই অন্য বিবাহ করলে আমার সন্তান হবে? হবে না বাবা। আমার মধ্যে কিছু সমস্যা আছে। তাই আমি একটা না হাজারটা বিয়ে করলেও আমার এই ইচ্ছাটা পূরণ হবে না। আর তুমিই তাে বলেছে মানুষের জীবনে কিছু ইচ্ছা অপূর্ণ থাকা স্বাভবিক ব্যাপার। তাই মনে করাে আমার সন্তানের মুখ থেকে দাদা-দাদী ডাক শােনার ইচ্ছাটা তােমাদের অপূর্ণই রইলাে।

কথা শেষ করে আসাদ আর দাড়ালাে না। ঘরে চলে গেল। আসাদের মা-বাবা থ হয়ে দাড়িয়ে রইলাে। তাদেরও মুখে কোন রা নেই।হতভাগ হয়ে দুজন চোখাচোখি করলাে। কিছু সময় পর তারা স্বাভাবিক হলেন।

মা বললাে- অপয়া,অলক্ষী,বন্ধ্যা মেয়েটা আমার ছেলেকে কি জাদুটাই না করলাে? ছেলের মগজ একেবারে ধােলাই হয়ে গেছে।

আমি এই মেয়েকে দেখে নিবাে। আসাদকে আবার বিয়ে করাবাে। বাচ্চা না হলে সেটা কেবল মেয়েদেরই দোষ,এতে ছেলেদের কোন দোষ থাকে না। বাবা উচ্চ স্বরে বললাে।

তিনি কোন ভাবেই আসাদের দুর্বলতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। আসাদের যে সমস্যা থাকতে পারে তাও তিনি বিশ্বাস করছে না। তাই তার উদ্দেশ্য নগদ টাকা যৌতুক নিয়ে আসাদকে আবার বিয়ে করাবে।

এই হলাে আমাদের মানসিকতা। এই হলাে আমাদের সমস্যা। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অনেকদেশেই সন্তান না হলে তার দায়-ভার এককভাবে স্ত্রীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এধরণের প্রবণতা মােটেও বিজ্ঞান দ্বারা সমর্থিত না বরং এটি বিজ্ঞান বিরােধী। অশিক্ষা ও কুসংস্কার হতে এ ধরনের প্রবণতা সৃষ্টি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে বিশ্বেও ১০ থেকে১৫% দম্পতি সন্তান জন্মদানে অক্ষম। এসব দম্পতির মধ্যে ৪০% দায়ী স্বামী-স্ত্রী উভয়ই, ২০%দায়ী কেবল স্বামী, ৩০% দায়ী কেবল স্ত্রী এবং বাকি ১০% এর কারণ অজানা। বাংলাদেশে এসংক্রান্ত কোন পরিসংখ্যান নেই। তাই এখানে শুধু নারীকেই এই সমস্যার জন্য একক ভাবে দায়ী করে তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এমনও হয়,কোন দম্পতির সন্তান না হওয়ার কারণে স্বামী-স্ত্রী আলাদা হয়ে যায়। পরবর্তীতে স্ত্রীর অন্যত্র বিয়ে হলে সে সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্বামীও সন্তান জন্মদানে অংশ নিতে সক্ষম হয়। তাই উভয়কেই এই ব্যাপারে সমানভাবে দায়ী করতে হবে। কিন্তু আমাদের এই সমাজ তা মানে না। আসাদেরমা-বাবাও তা মানছে না। আর তারা মানবেও না। কারণ অশিক্ষা ও কুসংস্কার তাদের রক্ত-রন্ধ্রে মিশে তাদের বিবেবহীন করে তুলেছে।

আসাদের মামা আসাদদের বাড়িতে এসেছে। আসাদকে নতুন বিয়ে করাবে এবং শানুকে তালাক দেওয়াবে। মা-বাবা,মামার সাথে এই সিদ্ধান্ত নিল। মামা এতে বেশ খুশি তিনি রাজি হলেন এবংবললেন- পাত্রী আছে আমার হাতে। আসাদকে খালি রাজি করাও বুবু,ও রাজি হলে পাত্রী দেখতে যাবাে।

বাবা আসাদকে ডেকে আনলেন। মামা আসাদের মত জানতে চাইলেন। আসাদ রাগান্বিত হয়ে মামাকে বললাে-এই মুহূর্তে আমাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও মামা। কোন সাহসে তুমি আমায় এই কথা বললে?

মামা হেসে বললাে-দেখ বাবা,তাের মা-বাবার বয়স হয়েছে। তাদের বড় শখ নাতি-নাতনীর মুখ দেখা শানুর মধ্যে দোষ আছে,সেকারণে তােদের সন্তান হচ্ছে না। তুই বরং আরেকটা বিয়ে কর। দেখবি তর সন্তান হবে।

মা-বাবার শখ কি তা আমি জানি। আর শােন দোষ আমার, শানুর না। তাই আমাদের সন্তান হয়না। (আসাদ)

কি যে বলিস তুই বাপ? তাের দোষ হবে কেন? ছােটবেলা থেকে শুনে আসছি সন্তান না হলে মেয়েরা দায়ী সেটা কেবল মেয়েদেরই দোষ। (আসাদের মামা)

আচ্ছা মামা,মনে করাে এখন তুমি লেবুর শরবত খাবে। তাই তােমার প্রথমে দরকার হবে লেবু এবং পানিভর্তি একটা গ্লাস। তাই তাে? (আসাদ)

হুম। (আসাদের মামা)

তােমার কাছে যে লেবু আছে সে লেবুতে যদি রস না থাকে তবে কি তুমি শরবত খেতে পারবে? (আসাদ)

না। (আসাদের মামা)

আমার ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই হয়েছে। তােমরা বরং আনিসের জন্য মেয়ে দেখ। আমি নতুন করে আর কোন বিয়ে করবাে না। আর আমার ব্যবহারের জন্য দুঃখিত মামা। আমায় মাফ করে দিও আসাদের স্বর মৃদু হয়ে গেল।সে চলে গেল।

( চলবে… )

ব্রেকিং নিউজ