পর্ব-৫ঃ আজ শানুর মন ভালো নেই – ” শানুর সন্তান “পাঠের সময় : 6 মিনিট

লেখকঃ মোঃ মতিউল্লাহ

বেশ কয়েকমাস হয়ে গেল। শানুর মধ্যে কোন পরিবর্তন নেই। অর্থাৎ গর্ভে সন্তান আসলে মেয়েদের মধ্যে যে কিছু পরিবর্তন দেখা যায় তার কোনটাই শানুর মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। শানু সন্তানসম্ভবা কিনা, তা দেখার জন্য আসাদ প্রায়ই ঔষুধের দোকান থেকে কিট নিয়ে আসে। এই পর্যন্তকরা সকল পরীক্ষায় শানু ব্যর্থ। গর্ভে সন্তান আসলে মেয়েদের দেহ থেকে এক ধরনের হরমােন প্রশ্রাবের সাথে ক্ষরিত হয়। এই হরমোন প্রস্রাবে আছে কিনা তা দেখা হয় ওই কিট দিয়ে। আসাদের চোখে মুখে চিন্তার ছাপ। শানুর মন বিষন্ন। কারণ সে পরীক্ষায় সফল হচ্ছে না। তার বমি বমি ভাব হচ্ছে না,মাথা ঘুরছে না,টক খেতে ইচ্ছে করছে না। তবে কি আমি সন্তান জন্মদিতে অক্ষম? এটা ভেবেই শানুর গায়ে কাটা দিয়ে উঠলাে। শানুর ম্যাট্টিক পরীক্ষার ফলাফলপ্রকাশিত হয়েছে। আনিস স্কুল থেকে ফলাফল জেনে বাড়ি আসলাে। সে সেকেন্ড ডিভিশন পেয়ে পাস করেছে। বাড়িতে তাকে নিয়ে বেশ আনন্দ হৈ হুলুর হচ্ছে। আনন্দতাে হবেই কারণ এই প্রথম তাদের কেউ ম্যাট্টিক পাশ করেছে। শানু তার নিজের ফলাফলের কথা ভেবে অনেক দুশ্চিন্তা করেছে। দুপুরের পরে শানুর বাবা ও শাহাদ শানুর বাড়িতে আসলাে। বাবা এবং শাহাদকে দেখে তার বেশ আনন্দ হলাে। সে শাহাদকে জড়িয়ে ধরলেন। তাদের এবং মায়ের খোঁজ খবর নিলেন।

বাবা মিষ্টির হাড়ি শানুর হাতে দিয়ে বললেন, আমরা ভালাে আছি,তর মাও ভালাে আছে। (বাবা)

বাবা ও ভাইকে শানু ঘরে নিয়ে বসাল।

তাের পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে। কফিলউদ্দিন স্যার বাড়িতে সে খবর দিয়ে গেছে। তাই তােকে জানাতে এলাম। (বাবা)

ফলাফল দিয়েছে জানি, আমার দেবর আনিসও এবার পরীক্ষা দিয়েছিল। সে সেকেন্ড ডিভিশন পেয়ে পাশ করেছে। আমার ফলাফল কি সেটা কি স্যার তােমায় বলেছে বাবা?

হুম,তুইও সেকেন্ড ডিভিশন পেয়ে পাশ করেছিস।

বাবার কথা শুনে শানু আনন্দে লাফিয়ে উঠল। শানুর বাবা জামাই ও শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে দেখা করে দুপুরের খাবার খেয়ে বেলা থাকতেই তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাে। বাবা ও ছােট ভাইয়ের বিদায়ের পরেই শানু আবার বিষন্ন হয়ে গেল।

আসাদ শানুকে প্রশ্ন করলাে- কি হয়েছে?

কিছু হয়নি।

তবে মুখ বিষণ্ণ করে রেখেছে কেন?

কই বিষণ্ণ? আমি ঠিক আছি।

একটা ব্যাপার নিয়ে ভেবেছি আমি। (আসাদ)

কি ব্যাপার? (শানু)

ভাবছি তােমাকে নিয়ে শহরে যাবাে। আমরা দুজন ভালাে কোন ডাক্তারের সাথে সাক্ষাৎ করবাে। (আসাদ)

আমি মনে মনে ভেবেছিলাম এই কথা। কিন্তু বলার সাহস হয়নি। (শানু)

ধুর পাগল,আমাকে তুমি নির্দিধায় সব বলবে। আমি তােমার কোন কিছুতে কিছু মনে করবােনা। (আসাদ)

শানু হ্যাঁ বােধক মাথা নাড়ল।

আসাদ আরাে বললাে মহাজনের পুত্রবধূ সন্তান সম্ভবা। গত সপ্তাহে তারা শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছে। আমি কাল আড়তে গিয়ে মহাজনের কাছ থেকে সব খােজ নিয়ে আসবাে।

পরদিন আসাদ আড়তে গিয়ে মহাজনের কাছ থেকে সকল তথ্য জানল। মহাজন তাকে সব তথ্য দিলেন এবং তাদের মঙ্গল কামনা করলেন। আসাদ বাড়ি ফিরে শানুকে সব জানাল এবংআগামী বুধবার শহরে যাবে বলে স্থির করল।

মাকে তুমি জানিয়ে রেখ শানু। (আসাদ)

আচ্ছা,জানিয়ে দিবাে। (শানু)

বুধবার সকালে তারা দুজন খেয়ে রওনা হলা শহরের পথে। শহরে পৌছতে পৌছতে দুপুর ১২ টা বেজে গেল।হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখানাের জন্য তারা সাক্ষাতের খাতায় শানুর নাম শাহানাজ’ লিখিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। বেশ খানিকক্ষণ পরে ডাক্তারের এক কম্পাউন্ডার শাহানাজ বলে ডেকে উঠলেন। আসাদ ও শানু ডাক্তারের চেম্বারে প্রবেশ করল। আসাদ ডাক্তারকে তাদের সমস্যাগুলাে খুলে বলল। ডাক্তার তাদের সমস্যার কথা শুনে তাদের দুজনকেই কয়েকটি পরীক্ষা করাতে বললেন এবং আজই তাদের রিপাের্টগুলাে ডাক্তারকে দেখাতে বললেন। তারা তখনই চেম্বার থেকে বের হয়ে পরীক্ষাগুলাে করায়। রিপাের্ট হাতে আসতে আসতে বিকাল হয়ে যায়। রিপাের্ট পেয়েই তারা আবার ডাক্তারের শরনাপন্ন হলাে। ডাক্তার তাদের রিপাের্ট দেখ হতবস্ত হলেন। তাদের দুজনেরই সমস্যা রয়েছে। আসাদের শুক্রাণু তৈরীর জার্মিনাল এপিথেলিয়াম কোষের সার্টলি কোষ অক্ষম। তাই বর্ধনশীল শুক্রাণুতে পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টি সরবারহ হচ্ছে না। প্রতিবার সঙ্গমে ক্ষরিত বীর্যে ৪-১০ কোটি শুক্রাণু থাকে। পুষ্টির অভাবে শুক্রাণু ডিম্বানুভেদ করে নিষেক ঘটাতে পারে না। অন্যদিকে শানুর জরায়ুর ভিতরে ফেলােপিয়ান নালী কিছুটা বেকে গেছে। যার ফলে এর ভিতর দিয়ে পর্যাপ্ত শুক্রাণু পরিবাহিত হতে পারে না।ডাক্তার তাদের দুজনকে আলাদা আলাদা ব্যবস্থাপত্র দিলেন। পুষ্টিকর খাবার খেতে বললেন এবং একমাস পরে আবার আসতে বললেন।

চেম্বার থেকে বের হওয়ার সময় আসাদ ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল, আমাদের সন্তান হবে তাে?

ঔষুধগুলাে নিয়ম মত খেয়ে কোর্স শেষ করুন আর আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। ইনশা-আল্লাহ্ আপনারা সফল হবেন। (ডাক্তার)

ডাক্তারের কথা শুনে আসাদ আনন্দিত চিত্তে চেম্বারথেকে বিদায় নিলেন।

তাদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। আসাদের মা-বাবা তাদের অপেক্ষায় বসে রইল একসাথে খাবে বলে।তারা বাড়ি ফিরে কাপড় ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে খেতে আসল।

মা আসাদের পাতে ভাত বেড়ে জিজ্ঞেস করলেন-ডাক্তার কি বলেছে রে আসাদ?

তেমন কিছু বলেনি,ঔষুধ দিয়েছে নিয়ম মত খেতে বলেছে।

আর কিছু বলেনি?

একমাস পরে আবার দেখা করতে বলেছে।

এটাই হল ডাক্তারদের সমস্যা।একটা রােগী পেলে তাকে চুষতে থাকে। সাতদিন,পনেরােদিন,একমাস পরে আবার দেখা করতে বলে। একবারে কি তারা ঔষুধ দিতে পারে না? যে ঔষুধেরােগী সুস্থ হয়ে উঠবে। রাগান্বিত স্বরে বাবা বললাে।

আসাদ চুপ,কিছু বললাে না। শানু মাখা নিচুকরে ভাতে হাত নাড়ছে,খাচ্ছে না। শানুর মন ভালাে নেই। মন ভালাে না থাকলে কোন কাজই ভালাে লাগেনা। তাই সে খাচ্ছে না। আসাদ খাওয়া শেষ করে চুপচাপ উঠে গেল। একে একে সবার খাওয়া শেষ হয়ে গেল। সবাই উঠে গেল শানু রইলাে। পাতের ভাতে পানি চেলে সে হাত ধােয়ে থালা-বাটি সকালে ধােয়ার জন্য একত্রে রেখে ঘরে চলে আসল। ঘরে বসে আসাদ ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ঔষুধ খেল এবং শানুর ঔষুধগুলাে টেবিলে তুলে রাখল। শানু ঘরে ঢুকামাত্রই আসাদ বললাে টেবিলে রাখা ঔষুধগুলাে খেয়ে নাও। সে ঔষুধ খেয়ে হতাশ মনে আসাদের পাশে শুয়ে পড়লাে। দুজনের দৃষ্টি উপরের দিকে।

কয়েক মুহূর্ত নিরব থাকার পর শানু আসাদকে বললাে, তােমার মন খারাপ কেন?

বিয়ের পর এই প্রথম আসাদ শানুর স্বরে কান্নার আভাস পেল। তাই সে শানুর দিকে ফিরে হাতটাকে ত্রিভুজাকৃত্রির করে হাতের উপর মাথার সকল ভাররেখে বললাে আমার মন খারাপ না।কিন্তু,

কিন্তু বলার সাথে সাথে শানু বললো তবে আজ এত চুপচাপ রইলে যে কোন কথা বলছাে না কেন?

সারাদিন বাহিরে ছিলাম,তাই ক্লান্তি লাগছে। তাই একটু চুপচাপ আছি। কিন্তু তােমার মন খারাপ কেন?

সাথে সাথে শানু ফুপিয়ে কান্না করে আসাদকে জড়িয়ে ধরলাে। কান্না বিজরিত কণ্ঠে সে বললাে- আমি কি কখনাে মা হতে পারবাে না?

ধুর পাগল শান্ত হও,কান্না বন্ধ করাে। কেন পারবে না? অবশ্যই পারবে।

সত্যি পারবাে?

হুম,সত্যি পারবে।

শানু একটু ভরসা পেল ।সে আসাদকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে গেল।

নিয়মত ঔষুধ খেয়ে তারা একমাস পরে আবার ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার আবার তাদেরপরীক্ষা দিলেন এবং তারা পরীক্ষা করে ডাক্তারকে রিপাের্ট দেখালেন। ডাক্তার রিপাের্ট দেখলেন। আসাদের অবস্থা ভালাে শানুরও ফেলােপিয়ান নালীর সমস্যা সমাধান হয়েছে। কিন্তুএখন তাদের হরমােনের কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে।তাই ডাক্তার তাদের হরমােনের সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু ঔষুধ দিলেন। যা তারা নিয়মমত খেয়ে কোর্স শেষ করে আবারও ডাক্তারের শরনাপন্ন হন। এভাবে চলতে চলতে তিন বছর এক নাগারে তারা ডাক্তারের পরামর্শ নিলেন।কিন্তু আশানুরূপ কোন ফল পেলেন না। এদিকে বাড়িতে প্রতিনিয়ত শানুর শ্বশুর-শাশুড়ি তাকে কথাশােনায়। শানু ত্যাক্ত-বিরক্ত। আসাদ বাড়ি থাকা অবস্থায় কেউ শানুকে কথা শােনায় না। আর তাই শানু আসাদকে কিছু বলেনা এই ব্যাপারে। স্বামীর সংস্পর্শে এসে সে স্বামীর কিছু গুণ খুব শক্ত করে আয়ত্ত করেছে। সেটা হল ধৈর্য ধারণ করা,পরনিন্দ,পরচর্চায় কান না দেয়া তাছাড়া শানুর বাবা বিয়ের পরে তাদের যৌতুক হিসেবে কোন কিছুই দেয়নি. দিতে চেয়েছিল কিন্তু আসাদ তা আনেনি।

আসাদ তার শ্বশুরকে যৌতুকের ব্যাপারে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছে- বাবা চায়,চাক। আপনি কিছু দিবেন না।আপনি শুধু আমাদের জন্য দোয়া করবেন।এটাই আপনার প্রতি আমার চাওয়া।

যার কারণে আসাদের বাবা শানু প্রতি ক্ষিপ্ত। আর মা, সেতো সারাদিন প্রতিবেশী মহিলাদের সাথে শানুর ব্যাপারে অনেক কথা পাঁচকান করে। যা পরবর্তীতে ঐসব মহিলাদের মাধ্যমেই শানুর কানে আসে। প্রতিটা পাড়ায় প্রতিটা সমাজে প্রতিটা গ্রামে এই চক্র বিদ্যমান থাকে। এমন কিছু দু’মুখাে মহিলা থাকে আমাদের এই গ্রাম্য সমাজে,যারা শ্বাশুড়ির সাথে মিল দিয়ে শ্বাশুড়ির পেটের কথা এবং বউয়ের সাথে মিল দিয়ে বউয়ের পেটের কথা বের করে বউ-শ্বাশুড়ির সাথে মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগায়। কিন্তু শানুর বেলায় ওই সকল মহিলারা সফল হতে পারেনি। কারণ সে তার স্বামীর মত নিজের কষ্টকে মনে চাপা রাখে। স্বামীর মত সে ধৈর্য ধারন করতে পারে। তার মার্জিত আচরণ এবং সৌজন্যবােধে সবাই আকৃষ্ট হয়ে শ্বাশুড়ি সম্পর্কিত সকল তথ্য তারা তাকে দেয়। কত শত ষড়যন্ত্র,কত কটু কটু কথা। সব শুনেও সে নিরব থাকে। কোন প্রতিবাদ করে না। কারণ সে দুর্বল এক দিক থেকে। তার সন্তান হয় না।তাই তার এই দুর্বলতার জন্য তাকে নিয়ে নানা কুটুক্তি এবংষড়যন্ত্র করার হক তাদের আছে।

( চলবে… )

ব্রেকিং নিউজ