পর্ব-৪ঃ ওয়েলকাম টু ভালবাসার গলি – ” বিভ্রান্তি “পাঠের সময় : 5 মিনিট

← পূর্ববর্তী পর্ব — পর্ব-৩ঃ ওয়েলকাম টু ভালবাসার গলি – ” অন্তরের রোগ “

এই প্রথম ভালো কোনো তথ্য দিল মন মিয়া। আসলেই যে –“ অন্তর আকাঙ্ক্ষা রোগ” থেকে বাঁচা বড় মুশকিল নিচের তলাগুলোয় ভালই দেখে এসেছে ড্রিচ আর লিথান। যদিও অনেকে আক্রান্ত হয় নি তাদের মনের জোরে, কিন্তু কে বা জানে তারা হয়ত তেমন ভালো কোনো মানুষের দেখাই পায় নি আজীবন।

ড্রিচ আর লিথান বুঝতে পারলো –“ অন্তর আকাঙ্ক্ষা রোগ” , এই রোগের স্থায়ী সমাধান আসলে এই ৬ তলার হাতেম সাহেবের কাছেই আছে। হাতেম সাহেব আবার বলে উঠলো –” আসলে এইযে বিয়ের আগে ও পরে , আসলে সারা জীবন বিপরীত লিঙ্গ থেকে নিজেকে মক্তো রাখাই হল একমাত্র ঔষধ।“

ড্রিচ বলে উঠলো –” তাহোলে কি মানুষ ভালোবাসবে না? “। হাতেম সাহেবের জবাব –” হ্যাঁ , বাসবে, কিন্তু তা শুধু মাত্র তাঁর স্ত্রী বা স্বামীকে। আর ভালোভাবে মন থেকে চাইলে আপনার ভালো সঙ্গী জুটবে অবশ্যই । কিন্তু সেটা শুধু একবারই।“

ড্রিচ তাই প্রশ্ন করলো –” কিন্তু এমন ও তো হতে পারে যে আমার জন্য আরো ভালো সঙ্গী অপেক্ষা করছিলো। খুঁজার চেষ্টাই যদি না করি তাহলে তো আমরা অপূর্ণই থেকে গেলাম ।“ হাতেম সাহেব হাসতে হাসতে বলল –” আপনারা এতো তলা ঘুরে এটা বুঝতে পারলেন না যে খুজতে থাকলে আপনি সারা জীবনই খুজতে পারবেন, আপনার খোজা শেষ হবে না…হা হাঁ হাঁ … সারা পৃথিবীর অর্ধেক লোক আপনার বিপরীত লিঙ্গের…তো আপনার পার্ফেক্ট পার্টনার পেতে হলে সবার সাথে প্রেম করাটাই একমাত্র উপায় নয় কি? হা হা হা “।

 ড্রিচ আর লিথানের চিন্তাভাবনাই পালটে গেলো কথাটা শুনে…। আসলেইতো আমরা যে সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজতে বের হয়েছি সেটা খুজতে গেলে তো আমাদের পৃথিবীর সব বিপরীত লিঙ্গের মানুষ কেই যাচাই করে দেখতে হবে যে কে আমার যোগ্য। হতে পারে এশিয়ার একজনের যোগ্য হয়তো আন্টার্ক্টিকায় পাওয়া গেলো।

হাতেম সাহেব বলে উঠলেন —” একটা কথা মনে রাখবেন আপনার জন্য পার্ফেক্ট সঙ্গী খুজতে যাওয়া বোকামি। কারন সত্যিকার অর্থে তা কি সম্ভব? না সম্ভব নয়। আসলে সত্যিকারের ভালোবাসা হচ্ছে  যা আছে তাই আপন করে নেওয়া। আর তাকেই ভালোবেসে যাওয়া। “

৬ তলায় এসে ড্রিচ আর লিথানের সব ধারনাই পাল্টে যাচ্ছে। হাতেম সাহেব ও তাদের মতই যে সব তলা ঘুরে এসে এই সর্বাধিক ভালো পথটির দেখা পেয়েছেন তা বলাই যায়। উপরে আর কোনো তলাও নেই। আছে শুধু ছাঁদ।

হাতেম সাহেব বলল—“ চলুন ছাঁদ থেকে ঘুরে আসি “। ড্রিচ আর লিথানো তাই হেঁটে চলল হাতেম সাহেবের পিছু পিছু। ছাঁদে পৌছতেই প্রচণ্ড শব্দে কান ধরে গেলো সবার। শব্দ আসছে চিলেকোঠার এক রুম থেকে । কারা যেন ভিতরে কাউকে আটকে রেখেছে। বের হওয়ার চেষ্টা করছে ভিতরের ওরা। হাতেম সাহেব ঘরটা দেখিয়ে বলল—” এখানে আটকে রাখা হয়েছে সমকামী আর বহুবিবাহ নিয়ে প্রশ্ন তোলা লোকজনদের। বহুবিবাহওয়ালারা আমাদের ৬ তলার লোকজনদের ৪ বিয়ে করা নিয়ে  একটা ধারনার বিপক্ষে প্রশ্ন তোলে। কিন্তু তাদেরকে এটা বোঝাতে পারিনা যে ওই তত্ত্ব অনেক আগে যুদ্ধ কালীন সময়ের জন্য বলা হয়েছিলো। এখোন আর এইটার মুল্য নেই। তাও তাদের এটা বুঝানোই মুশকিল। তাই তারা এখানে। “

ড্রিচ বলে উঠলো—” তা বুঝলাম কিন্তু সমকামীরা কী দোষ করলো।“ হাসতে হাসতে হাতেম সাহেব উত্তর দিলো –” ওরা বলে সমকামিতা নাকি হরমোনাল কারণে। কিন্তু সমকামিতা যে সম্পূর্ণ মানসিক একটা রোগ। হরমনাল কোন প্রব্লেম না তা বুঝতে হলে একটু বিজ্ঞান নিইয়ে পরলেই বুঝা যায়। এরা আসলে সমাজে নতুন কুসংস্কারের প্রচলন করতে চায়“। কথাগুলো বুঝতে পারলো ড্রিচ আর লিথান।

এবার নিচে নামার পালা। হাতেম সাহেবকে বিদায় দিয়ে নিচে নেমে এলো ড্রিচ আর লিথান। সাথে মন মিয়া। মন মিয়া বলে উঠলো –“স্যার, রুম নিবেন না? কোন তলায় বুকিং দিমু? “ । ড্রিচ বলে উঠলো –” নাহ আজ আর না…অন্য একদিন… কিন্তু বুকিং দিলে ৬ তলায় ই দিব”। মন মিয়া বলে উঠলো –“আচ্ছা স্যার …আবার আইসেন… আমি রুম গুছায়া রাখমু নে।“ লিথান বলব—” মন মিয়া তুমি অনেক ঘুরিয়েছো। কিন্তু যাক ভালো একটা ফ্লোর খুঁজে পাইলাম। আজ তাহলে আসি“।

মন মিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো ড্রিচ আর লিথান । বেরিয়েই দেখতে পেলো সেই ট্যাক্সি ড্রাইভ্রারকে। এসেই বলল—“ সালাম স্যার, হোটেল দেখা অইসে?? চলেন তাইলে আবার দিয়া আসি আপনাগো। “।

ড্রিচের আর লিথানের ভালোই হল । পথে তাকে কিছু প্রশ্নোও  করা যাবে। উঠেই পড়ল ড্রিচ আর লিথান ।

গাড়ি চালু হল। ড্রিচ জিজ্ঞাস করলো –“আপনার বাসা কই? থাকেন কোথায়?”। ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার  বলল—” আমি এই গাড়িতেই থাকি। আমার পুর্বপুরুষ এই হোটেলেই থাকতো। কিন্তু আমি গাড়িতেই থাকি। হোটেলের কোনো তলাই পছন্দ হয় নাই আমার। “

লিথান বলল –” ৬ তলাও না? ওইটা তো খুবই শান্তির তলা। সবচেয়ে ভাল“। 

হেসে উঠলো ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার ,বলল—” ওই ৬ তলা আমারো পছন্দ হইসিল। কিছুদিন ছিলাম ও। কিন্তু ওইখানেও হালকা সমস্যা পাইসি। তারপর থাইকা আমি গাড়িতে থাকি। মানুষ আমারে কয় আমার নাকি মন নাই। কিন্তু আমারো মন আসে ,তবে ফ্লোরে প্রব্লেম থাকলে আমি কি জোর কইরা থাকমু?? তাই  এতদিন গাড়িতে থাকসি আর খুজসি এই উত্তর। সবচেয়ে ভালো কথা আমি রুম পাইয়াও গেসি। এহন থাইকা আমারে আর কেউ মন সারা মানুষ কইতে পারবো না। এমন এক রুম পাইসি যেইডাতে কোন প্রব্লেম নাই । ৬ তলায় যেই প্রব্লেমডা ছিলো ঐডার উত্তরও পাইসি এই রুমে… এখন খালি আমার শান্তি আর শান্তি“।

ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার এর কথা শুনে চোখ উপরে উঠার জোগাড় ড্রিচ আর লিথানের। ৬ তলায় কি সমস্যা আছে যেটা ড্রিচ আর লিথান খুঁজে পায়নি ? আর কেমন ভাবে তাঁর সমাধান খুঁজে বের করেছে ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার ?

এগুলো ভাবতে ভাবতেই গাড়ি চলে এলো  পোর্টালের সামনে। নামতে হলো ড্রিচ আর লিথানকে।যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের প্রশ্নগুলোর উত্তরতো তাদের চাই। তা না হলে যে তাদের এই জার্নি থেকে যাবে অধরা।   তাদের নামিয়েই ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার  আবার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিলো। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ড্রিচের হাতে ধরিয়ে দিলো একটা ভিসিটিং কার্ড। আর বলল – ” এইটা আমার নতুন বাসার ঠিকানা। সময় পাইলে ঘুরতে আইসেন । দোয়া করবেন ভাইজান। আবার দেখা হবে। “ ।

বলেই ধোঁয়ার এক কুণ্ডলী ছড়িয়ে গাড়ি নিয়ে চলে গেলো ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার, পেছনে শোনা যাচ্ছে সেই গান –” আমার মত এত সুখী , নয়তো কারো জীবন…”।

ড্রাইভ্রার চলে গেলে ড্রিচ আর লিথানের দৃষ্টি গেল কার্ড এর উপর। কার্ডের এইদিকে লিখা —”সমস্যাঃ ৬ তলার নিয়মে আপনি বিয়ে করলেন, একজনকেই ভালবাসলেন ঠিক। কিন্তু আপনি ঠিক থাকলেও সে যদি বিয়ের পর আপনার সাথে ধোঁকাবাজি করে তাহলে কি করবেন ?” ।

লেখাটা পরেই ড্রিচ আর লিথান দুজন দুজনের দিকে তাকালো। কিন্তু কার্ডটার পেছনেই ঠিকানা লিখা ছিল ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার এর নতুন  রুম এর, যেখানে সে এই প্রশ্নেরও উত্তর পেয়েছে।

 পেছনে লিখা—” Surah Ar-Ra’d – ayat 21 [ surah no. 13 , ayat no. 21] “। ঠিকানাটা বুঝতে পারে না ড্রিচ আর লিথান , বোকার মত ফিরে চলে দুজন……।

সমাপ্ত

Comments are closed.

ব্রেকিং নিউজ