পর্ব-৩ঃ ওয়েলকাম টু ভালবাসার গলি – ” অন্তরের রোগ “পাঠের সময় : 5 মিনিট

← পূর্ববর্তী পর্ব — পর্ব-২ঃ ওয়েলকাম টু ভালবাসার গলি – ” প্রেমের ঊর্ধ্বযাত্রা “

তলা নাম্বার ৫ । ঢুকতেই নাম আসলো “ প্রস্থানকারীর জন্য ত্যাগ নয়” ।

দেখা গেলো তলাটা খুব বড় নয়। ছিমছাম একদম। একজন খুব আলাপ মারছিলো। ৪০ বছরের ভদ্রলোক। আর সাথে ৩০ বছরের এক নারী। কাছে গিয়েই জানতে চাইলো ড্রিচ একেবারে সোজাসুজি–“ আপনাদের এক ফ্লোরের সমস্যা কী? “। লোকটি হেঁসে  উঠলো –” আরে ভাই এখানে কারা থাকে আগে তো শুনবে নাকি?? এখানে আমরা সবায় ৪ তলার লোক ছিলাম… আমরাও অন্তর দেখে ভালবাসতাম… কিন্তু আমরা সবাই আমাদের প্রেমিক প্রেমিকার কাছ থেকে ধোকা খাই…অনেকেই ওই ধোকা নিয়েও বেচে থাকে …কিন্তু আমরা নিজেরাই আমাদেরকে আবার আক্রান্ত করেছি… আমাদের মূলনীতি হলো ধোঁকাকারীর জন্য কোনো ত্যাগ নয়…আমরা তাই আবার প্রেম করেছি…কিন্তু এবারও অন্তর দেখে… তাই আমরা আলাদা…আমরা কারো সাথে ধোঁকা করি নি…এমনকি নিজেদের সাথেও না… একটা ধোঁকা বাজের জন্য জীবনে আর প্রেম না করা নিজের সাথেই ধোকাবাজি…তাই নয় কি ?? “।

 কথার কোনো জবাব দিতে পারলো না ড্রিচ আর লিথান। কারন তাদের মধ্যে সব আছে …তারা অন্তর দেখে প্রেম করে…তারা রোগ এও আক্রান্ত হন নি…আবার নিজেদের সাথেও ধোঁকাবাজি করেন নি ,একজন ধোকাবাজের জন্য…। ড্রিচ আর লিথান একপ্রকার আটকিয়ে গেলো। এই তলাকেই হয়ত সেই শান্তির তলা বলা যায়।

ঠিক তখন ই জোরে একটা ঘন্টার আওয়াজ শোনা গেলো। ফিরে তাকাতেই দেখা গেলো একদল লোক কে বেধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কথা যাচ্ছে জিজ্ঞাসা করলে মন মিয়া বলল—“ ওরা এখানেও ধোঁকাবাজি করেছে… তাই নিচে নিয়ে যাওয়া হবে… “। মন মিয়ার কথায় কোনো পাত্তা দিলো না ড্রিচ আর লিথান। কারন এখানে ধোঁকা দিলে সমস্যা নেই… আবার তারা অন্তরের মিল করে নতুন মানুষ খুঁজে নেবে।

ড্রিচ আর লিথান তাই সময় কাটাতে লাগলো ৫ তলায়। কিন্তু প্রায় আধা ঘন্টা পরেই আবার একটা ঘন্টা বাজলো। আবার এক ই চিত্র দেখা গেলো। ড্রিচ আর লিথানের খটকা লাগলো তাতে। তারা উত্তর খুজতে শুরু করলো। কিন্তু ভাগ্য তাদের সহায় হলো না এইবার। তারা খুঁজে পেলো না কেনো ঘন ঘন এই ফ্লোরের মানুষেরা ধোঁকাবাজি করেন? ড্রিচ আর লিথানের কপালে তখন চিন্তার ভাঁজ। কারন যতই শান্তি থাকুক না কেনো …তা যদি খুব এ ক্ষণস্থায়ী হয় তাহলে সেই শান্তির মূল্য থাকে না।

অবশেষে তারা খুঁজে পেল একজন কে। ৪০ বছরের এক যুবক। অনেক্ষন যাবত ফলো করছিলো ড্রিচ আর লিথানকে। সুযোগ বুঝে ইশারা করল , কিছু বলতে চায় সে। ড্রিচ আর লিথান অনুমতি দিলে সে অনেক গুরুত্বপুর্ন তথ্য দেয় –“শুনুন, আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত না এই রোগটা––“ অন্তর আকাঙ্ক্ষা রোগ” –পুরোপুরি নির্মুল করতে পারছেন ততোক্ষণ কিন্তু আপনি শান্তিময় ভালোবাসার দেখা পাবেন না“। কথা শুনে কিছুই বুজতে পারল না ড্রিচ আর লিথান। লিথান বলে উঠলো –” একটা উদাহরন দিন তো”। যুবকটি বলল –” ভেবে দেখুন আমাদের ভেতর –“ অন্তর আকাঙ্ক্ষা রোগ”—রোগটি যতক্ষণ থাকবে ততোক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু আমরা একটা চক্রের মধ্যে থাকব। মানুষ বারবার ধোকা দিবে। আবার ধোঁকা খাওয়ার পর আবার নতুন মানুষকে ভালবাসবে। এই পর্যন্ত ঠিক ছিলো , কিন্তু যদি ওইখানেও আবার ধোঁকা দেয় কেউ…এভাবে একটা লুপ ক্রিয়েট হয়ে যাবে… “ ।

লোকটির কথা শুনে ড্রিচ আর লিথান মন মিয়ার কাছে  ৫ তলার চার্ট চাইলো। তাতে তারা দেখতে পেল যে এখানকার অনেক লোক ই ৪ তলা আর ৫ তলার মধ্যে ঘুরাঘুরি করে। মানে একটি লুপ হোল তৈরি হয়ে গেছে। মন মিয়া বলে উঠলো –” আপনারা যে কি কন ,– সবায় কি সারাজীবন ধোঁকা খাইতেই থাকবো নাকি—একজন বেশি অইলে ২ বার ধোঁকা খাইব –অনেকে তো সারাজিবনেও ধোঁকা খায় না“ ।

লিথান জবাব দিলো—“ আমরা তো বলি নাই যে এই ৫ তলায় কেউ সুখে  নাই… প্রতিটা তলায়ই অনেকে সুখে আছে… সুখি মানুষ ৪ তলাতেও আসে , ৩ তলাতেও আসে, ২ তলাতেও আসে। কিন্তু আমরা খুজতেসি এমন একটা তলা যাইটাতে সবায় সুখী আর যেইটা স্থায়ী সমাধান“ ।

এইকথা শুনে আগের যুবকটি বলে উঠলো—” তো আপনারা এর উপরের তলায় যান না কেন?? এতক্ষণ পর্যন্ত  যত তলা দেখলেন সব ত মানুষের থিউরি দিয়া বানানো …উপ্রের টায় যান ওইটা নাকি কোন এক সৃষ্টিকর্তার থিউরি  দিয়া বানানো। যিনি নাকি সবই জানেন। “

কথা শুনে ড্রিচ আর লিথানের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো…।

তড়িঘড়ি করে তারা চলে গেলো উপরের তলায়। মন মিয়া সহ। ৬ তলায় ঢুকতেই তারা দেখা পেলো লেখা “ বিবাহ সর্বোত্তম পন্থা” । ঢুকেই দেখলো একজন বসে আছেন। প্রশান্তিময় চেহারা। নাম জানা গেলো হাতেম সাহেব। গিয়েই উনাকে সব খুলে বলল ড্রিচ আর লিথান। উনি তাদের নিয়ে গেলেন এক ঘরে । যেখানে ছিলো অনেক পুরোনো বই।

একটা বই তিনি খুলে দেখালেন আর বললেন —” মানুষকে পরীক্ষা করার  জন্য এই দুনিয়া সৃষ্টি করা হয়েছে। এই দুনিয়া আমাদের জন্য পরীক্ষা। তাই আমাদের ভেতর কিছু দুর্বলতাও আছে। কারন দুর্বলতা না থাকলে কেউ কতটা শক্তিশালী সেই পরীক্ষা নেওয়া অমূলক। আর তাই আমাদের ভেতর –“ অন্তর আকাঙ্ক্ষা রোগ” – এই রোগটা প্রাকৃতিক ভাবেই আছে। এটিকে নিজে থেকে কে কতটা নিয়ন্ত্রন করতে পারে সেটাই পরিক্ষা”।

কথা শুনে একটু খটকা লাগলো ড্রিচ আর লিথানের। লিথান বলে উঠল—” তাহলে ৫ তলা আর আপনাদের মধ্যে পার্থক্য কি রইলো?”। জবাবে হাতেম সাহেব বলে উঠলেন—” ৫ তলার ওরা জানে না কিভাবে এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে হয়। কিন্তু আমরা জানি। তাও এই ওষুধ আমরা বানাই নি। ওষুধ বানিয়েছেন যিনি আমাদের জন্য এই রোগ বানিয়েছেন তিনিই।“

এবার ড্রিচ বলে উঠল—“ কি সেই ওষুধ??” । হাতেম সাহেব বললেন—” আমরা বিয়েকে ভালোবাসার দলিল হিসেবে মনে করি। বিয়ে মানে দায়িত্ব। আমরা ৫ তলার মত শুধু ত্যাগ এই বিশ্বাসী না। আমরা দায়িত্ব দিয়ে এই ভালোবাসাকে করেছি আরো মহান। আর রোগ ? – বিয়ের আগে প্রেম ভালোবাসাকে করেছি হারাম। বিয়ের পর নিজ জোড়া ব্যতীত অন্য সবাইকে করেছি হারাম“।

ড্রিচ বলল –” জিনিসটা একটু বুজিয়ে বলবেন?” । হাতেম সাহেব বললেন—” এটা একটা বৈজ্ঞানিক বিষয়ই বলতে পারো। আসলে প্রাকৃতিক ভাবেই আমরা আমাদের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি ভালোবাসায় আকৃষ্ট হই। আর সেটা বার বার। এটা বৈজ্ঞানিক ভাবেই প্রমানিত। তাই আমরা পর্দার ব্যবস্থা করেছি। আমরা আমাদের দৃষ্টি, লালসা, সংযত রাখি। তাই আমরা এই রোগে আক্রান্ত হই না। আসলে আমরা এক সঙ্গী তে বিশ্বাসী । এভাবে আমরা আমাদের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করেছি। মানব মন এমন ভাবে সৃষ্ট যে আপনি আপনি আজীবন মানুষের প্রেমে পরতে থাকবেন। তাই আমরা বিপরীত লিঙ্গের সান্যিধ্য বর্জন করে আমাদের নিজেদের–“ অন্তর আকাঙ্ক্ষা রোগ” থেকে বাঁচাই।

লিথান জিজ্ঞাস করলো—“ ৪ তলার অনেকেও তাদের একমাত্র সঙ্গী ছাড়া বাকি সবাইকে ত্যাগ করে মনের জোর দিয়ে। এটাকে কিভাবে দেখছেন। “

হাতেম সাহেব বলল—“ আমি নিচের সব তলাতেই ছিলাম। একটা উদাহরন দেয়ে বুঝাই, আপনার জটিল কোনো রোগ হলো , আপনি ওষুধ খেয়ে সেরে উঠবেন। কিন্তু একজন ওষুধ ছাড়াই নিজের ইমিউনিটি দিয়ে সেরে উঠল। তাহলে ওই ব্যক্তিকে স্বাগতম। কিন্তু আপনিই বলুন , এমন কি সবায় হবে? তাই আপনি মনের জোরে যদি –“ অন্তর আকাঙ্ক্ষা রোগ” আটকে রাখতে পারেন তাহলে আপনার চোখের সংযম না করলেও চলবে।“

এইফাকে মন মিয়া বলে উঠলো –“এমন ও তো হতে পারে ওই ইমিউনিটি ওয়ালা লোক টা কোনোদিন জিবনে কোনো “অনেক ভালো অন্তরের” মানুষের দেখাই পায় নি। কঠিন ভাইরাসের দেখা পেলে এই –“ অন্তর আকাঙ্ক্ষা রোগ” হবেই।“ ।

কথা শুনে সবায় অবাক হয় তাকালো মন মিয়ার দিকে !! 

( চলবে… )

পরবর্তী পর্ব — পর্ব-৪ঃ ওয়েলকাম টু ভালবাসার গলি – ” বিভ্রান্তি “

Comments are closed.

ব্রেকিং নিউজ