পর্ব-২ঃ ওয়েলকাম টু ভালবাসার গলি – ” প্রেমের ঊর্ধ্বযাত্রা “পাঠের সময় : 6 মিনিট

← পর্ব-১ঃ ওয়েলকাম টু ভালবাসার গলি – ” ১৯-এর প্রথম দর্শন “

কথা বলতে বলতেই ২য় তলায় পৌঁছে যায় তারা। ঢুকতেই বড় করে লেখা “ দেহপ্রেম” । মন মিয়া বলে উঠলো –” স্যার এইটা আমাদের সবচেয়ে সুন্দর রুম। এইখানের সবই সুন্দর। থাইকা আরাম পাইবেন স্যার।“ রুম গুলো দেখেই বুঝা গেলো , আসলেই এই তলা পুরো চাকচিক্যময়। সেখানেই দেখা হলো এক লাস্যময়ীর সাথে । ২২ বছরের যুবতি মেয়ে। হাতের আইফোনটা দিয়ে মিরর সেলফি তুলছিলো। ২০১৯ সালেও আইফোন দেখে অবাকই হলো লিথান। কাছে গিয়ে কথা বলতে চাইল মেয়েটির সাথে। লিথান বলে উঠল—“ কেমন আছেন। এই তলার রুম গুলো কেমন?”। ফিরে তাকালো মেয়েটি। উত্তর দিলো –” এখানকার সব রুমই সুন্দর। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে খুব ই  এক্সপেন্সিভ। আর বেশিদিন থাকা যায় না।“ কথা শুনেই ড্রিচ জিজ্ঞাস করলো –“বেশি দিন থাকা যায় না কেনো?? “ । মেয়েটি জবাব দিলো –” এখানে অসুন্দর কেউকে থাকতে দেয় না । তাই যতদিন বয়স কম, সুন্দর আছি থেকে নিন । তারপর অন্যকোন তলায় শিফট হয়ে যাবেন। হা হাঁ হাঁ “।

এই তলার সব প্রেমিকেরা যে কামনা বাসনা আর রুপের অধিকারি তা সহজেই বুঝা গেলো। এই তলায় থাকা যে ক্ষণস্থায়ী তা এখানকার বাসিন্দারাই যেন মেনে নিয়েছে। পাশেই এক রুম এ অনেক গোলমালের শব্দ শোনা গেলো। মন মিয়া নিয়ে যেতে না চাইলেও ড্রিচ আর লিথান একপ্রকার জোর করেই ঢুকে গেল। দেখতে পেলো এক নারীকে আজ বের করে দেওয়া হচ্ছে। চেহারা দেখেই বুঝা গেলো আসল কারন যে তাঁর রুপ এর শোভা হ্রাস পাওয়া। মন মিয়া এক প্রকার ডিফেন্স দিয়েই বলে উঠলো—“ সমস্যা নাই, অন্য তলায় উইঠা যাইতে পাড়বো…”। কিন্তু অন্য তলায় যেয়েও যে মেয়েটি সুবিধা করতে পারবে না তা বুঝাই যায়।

মন মিয়া বলল – “ স্যার তাইলে উপ্রের তলায় চলেন…এই তলা আপানাগো পছন্দ না অইলে…”। ড্রিচ আর লিথানো চলল মন মিয়ার পিছনে।

উপরের ৩ তলায় ঢুকতেই ফুল দিয়ে লেখা “ অন্তরের প্রেম”। মন মিয়া বলে উঠল—” স্যার এই তলা আপ্নাগো পছন্দ হইবই…এইখান থাইকা বাইর হাওয়ার চান্স নাই…”। ৩ জনে ধুপ করেই ঢুকে পড়ল একটা কামরায়। মন মিয়া বলে উঠলো –“উনার লগে কথা কন …উনি এই তলার বড় ভাই এর মত…”। ড্রিচ আর লিথান তাকিয়ে দেখলো এক মধ্যবয়সী যুবক। বয়স ৩৩ হবে। চেহারা শ্যামলা । উনার রুমমেট উনার প্রেমিকা । বয়স ৩০ হবে। চেহারায় তেমন দ্যুতি নেই। সাধারন যুবক যুবতি। দেখেই বসতে বলল সবাইকে। যুবতি টি চা বানিয়ে নিয়ে চলে এলো। এই সুযোগে ড্রিচ তাদের রিলেশান সম্পর্কে জানতে চাইল। যুবকটি বলল—” আমরা শুধু মনের মিল আর অন্তরের সৌন্দর্য দেখে এই তলায় এসেছি… ভালোই চলছে দিন কাল…”। বুঝা গেলো এখানে আসলেই শান্তি। যুবতীটি মন মিয়াকে দেখিয়ে বলে উঠলো –” এই যে দেখছেন মন মিয়াকে , সবসময় চায় সবায় যাতে ২ তলাতে  থাকে। কিন্তু আমাদের ৩ তলায় আসলে মন মিয়া ভালো হয়ে যায়।“ যুবকটি ও বলে উঠলো –“সালা ২ তলাতে শয়তান থাকে এই মন মিয়া …আমাদের ৩ তলাতে  আসলেই পল্টি মাইরা ভালা হইয়া যায়।“ বলেই হাসতে থাকে সবাই।

ড্রিচ আর লিথান ঠিক করে এখানেই থাকা ভালো হবে। এই “অন্তরের প্রেম” তলাতেই শান্তি আর শান্তি।

মন মিয়া বলে – “স্যার আপনাগোরে  একটা জিনিস দেখাই“ । বলেই নিয়ে গেলো একটা রুম এ। রুম এ ঢুকতেই ড্রিচ আর লিথান দেখতে পেলো ২ জন সুন্দর কাপল। মন মিয়া বলল –” স্যার দেখেন মনে কইরেন না সব সুন্দররাই ১ তলায় থাকে ২ তলায় অনেক সুন্দরেরা থাকে। মনে কইরেন না যারা কালা তারাই অন্তরের প্রেম খুজে …সুন্দর অনেকেও অন্তরের প্রেম খুজতে পারে…হেরা ২ জন আরো শান্তিতে থাকে…”।

কথাটা শুনে ড্রিচ আর লিথানের আগ্রহ আরও বেড়ে গেলো এই ৩ তলার উপর। তারা ঠিক করল এখানেই তারা তাদের গবেষণার কাজ চালাবে।

ঠিক তখনি লিথানের মাইন্ডরিডারটা লিথানকে কিছু বলে উঠল। আওয়াজটা এসেছে মন মিয়ার কাছ থেকে। মন মিয়া নাকি কিছু লুকাতে চাচ্ছে। মন মিয়াকে তখনি জিজ্ঞাস করলো ড্রিচ, কিছু লুকাচ্ছে কিনা। অনেক জোরাজুরি করার পর মন মিয়া তাদের একটা রুমে নিয়ে গেলো।  মধ্যবয়সী এক যুবক বসে আছেন , মুখে মাস্ক  পরা। ভেতরে গেলো তারা । জিজ্ঞাস করতেই মনু মিয়া বলে উঠলো –” উনার একটা জটিল রোগ হয়েছে । উনি প্রথমে যাকে ভালোবাসতেন তাঁর চেয়ে সুন্দর মনের আরেকজনকে পেয়েছেন। এই রোগের নাম –“ অন্তর আকাঙ্ক্ষা রোগ”। এই রোগ মানুষের খুব সাধারণ একটা রোগ। মানুষের অন্তর নাকি সবসময় আরো ভালো অন্তরের মানুষ খুজতে থাকে। তাই মানুষের অন্তরে নাকি এই রোগ জেনেটিকালি ই থাকে। এই রোগকে সারানো যায় না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থাকে । এমন অনেকে নাকি আছে এই রোগে একাধিকবার ও আক্রান্ত হয়েছেন, ২ দিন পর পর আরো ভাল অন্তরের মানুষের দেখা তারা পেয়েছিলেন, তাই আগেরজনকে ছেঁড়ে দিতে হয়েছে। এই রোগ কোনো দিন সারবে না যদি তিনি এই তলায় থাকেন।“

মন মিয়ার কথা শুনে ড্রিচ আর লিথানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পরে গেলো। তাহলে উপায়?? মন মিয়া বলল –” এই রোগের ওষুধ নেই। কিন্তু এই রোগ নাকি কন্ট্রোল এ রাখা যায়। উপরের মানে ৪ তলার মানুষরা এই রোগটাকেও কন্ট্রোল করে ফেলেছেন। ওইখানের মানুষেরা এই রোগে আক্রান্ত হয় না…৩ তলার মধ্যে যারা এই রোগকে কন্ট্রোল করা শিখে যান তাদেরকে ৪ তলায় ট্রান্সফার করে দেওয়া হয় ” । শুনেই ড্রিচ আর লিথানের মুখ হাসিতে  ভরে উঠলো।

আর এক মুহুর্ত না এখনি যেতে হবে ৪ তলায়। ওইটাই সবচেয়ে ভালো হবে। ৩ জন চলে গেলো ৪ তলায়। ঢুকতেই লেখা দেখলো “ ত্যাগের প্রেম “। নাম এই বুঝা গেল এখানের প্রেমিকেরা তাদের সব আকাঙ্ক্ষা  বিসর্জন দিয়েছেন। ঢুকেই মনটা ভালো হয়ে গেলো  ড্রিচ আর লিথানের। এখানেই কাজ শুরু করবে তারা। ঢুকতেই চোখে পড়ল এক মধ্যবয়সী মহিলাকে। খুব এ হাসিখুশি চেহারা। শান্তির একটা নির্জাস লেগে আছে চোখে মুখে। ড্রিচ আর লিথান আগেই ঠিক করে রেখেছে এখানের শান্তির কারন নয় কোনো ধরনের অশান্তি আছে কিনা সেটা খুজে বের করবে। এবার মন মিয়ার কাছ থেকে মাইন্ডরিডারে কোনো আওয়াজ পাওয়া গেলো না। অন্য উপায় দেখতে হবে।

ঘুরতে শুরু করলো ড্রেচ আর লিথান। আর ফ্লোরের এক কোনায় পেয়েও গেলো কিছু। মনটা বেজায় খারাপ হয়ে গেলো সবার। এখানেও আবার ঝামেলা। ঝামেলা ছাড়া ভালবাসা কি তারা পাবে না কোথাও। ঢুকে গেল কোনার রুমটায়। একটা ৭০ বছরের মহিলা বসে কাদছেন। কিন্তু এবার মুখে মাস্ক নেই। মানে কোনো অসুখও নেই। মহিলাকে জিজ্ঞাস করলো ড্রিচ। মহিলা ঘুরে তাকিয়ে বলল—“ বাবা আমি আর আমার প্রেমিক এই ফ্লোরেই থাকতাম । আমরা দুজনকে দুজন অনেক ভালবাসতাম। কিন্তু একদিন আমার প্রেমিক রোগে আক্রান্ত হলো আবার।  –“ অন্তর আকাঙ্ক্ষা রোগ”। আমায় ছেঁড়ে সে চলে গেলো। কিন্তু আমি তো রোগে আক্রান্ত হই নি। তো আমার কি করনীয়। সে চলে গেছে আজ থেকে ৩০ বছর আগে। আজ আমার বয়স ৭০। আমি ঠিক ই তাঁর জন্য ত্যাগ করে গেলাম সারাজীবন। কিন্তু ও তো করলো না। এটা কোন ধরনের ভালোবাসা –এই ভেবে আমার মনে খুব কষ্ট হয়। আমি আরেকবার প্রেমে পরলাম না এই কস্ট আমার হয় না। কিন্তু ও আমাকে ছেঁড়ে গেল এই কস্ট আমার ঠিক হয়। ৭০ বছরেও এই কষ্ট আমার সাথেই আছে। এর উত্তর কি আমাকে দিতে পারবে? কি উত্তর দিবে–  হয় বলবে এই কষ্ট নিয়েই বেঁচে থাকতে আর না হয় রোগে আক্রান্ত হয়ে আবার আরেকটা প্রেম করতে? মানলাম আমাকে তোমরা আমার ত্যাগ এর জন্য বাহবা দিবে…কারন আমি আমার জায়গা থেকে ঠিক ছিলাম … কিন্তু কষ্টই যদি পেতে হয় তাহলে এই তলায় থেকে লাভই বা হল কি…কষ্ট পেতেই হলে তো আমি নিচের তলাগুলোতেই থাকতে পারতাম…২য় তলাতে থেকে কামনার রস পেতে পারতাম…তাই নয় কি?…আর কষ্টই যদি ভালোবাসা হয় তাহলে আমিও তো ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার ই হতে পারতাম…মন ও থাকল না ,ভালোবাসাও থাকলো না কষ্টও থাকলো না…”।

এতক্ষণে ড্রিচ আর লিথান ট্যাক্সি ড্রাইভার এর কাহিনিটা বুঝতে পারল। “ তোমরা যদি ভালো কোনো ফ্লোর খুঁজে পাও আমাকে জানিয়ো। আমার পরবর্তি প্রজন্ম যাতে এই ভুল না করে। “—বলে উঠলেন বৃদ্ধা।

এই ফ্লোরের খারাপ দিকটা বুঝতে পেরে ড্রিচ আর লিথানো প্রস্থান করতে উদ্যত হলো। মন মিয়াও সাথে চলল।  

( চলবে… )

পরবর্তী পর্ব — পর্ব-৩ঃ ওয়েলকাম টু ভালবাসার গলি – ” অন্তরের রোগ “⇢       

Comments are closed.

ব্রেকিং নিউজ