পর্ব-১ঃ ওয়েলকাম টু ভালবাসার গলি – ” ১৯-এর প্রথম দর্শন “পাঠের সময় : 5 মিনিট

হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত ড্রিচ। “কিরে থামলি কেন ?”-বলে উঠল লিথান। উত্তর দিলো না ড্রিচ।আজকাল আর এত দূর হাটতে ভাল্লাগেনা ড্রিচ এর। লিথানের সাথেও তাল মিলাতে পারে না এখন আর। ১৫৩ ঘন্টা হয়েছে রওনা দিয়েছে তারা। “আগের সুড়ঙ্গগুলোতো এতো লম্বা ছিলো না”-বলে ওঠে ড্রিচ। ব্যাগ থেকে বিস্কিট বের করে খেতে থাকে লিথান। ২২১ তম বছর এটা তাদের। সাল ২০১৯ – ট্রেকিং প্যাড এ দেখে নিলে দুজন। ২২৪১ সাল থেকে এসেছে তারা। পি.এইচ.ডি করা এতো কঠিন জানলে পড়ালেখা ছেঁড়ে দিতো কবেই- মনে মনে বলে ওঠে ড্রিচ। মাইন্ডরিডারটা অন করাই ছিলো লিথানের। ড্রিচ এর মনের কথাটা শুনেই হেসে উঠল সে। “সালার প্রফেসার আর সাবজেক্ট পেলো না। ভালোবাসা কাকে বলে ? এইটা কোনো টপিক হলো ?”- মনে মনে না ভেবে এইবার জোরেই বলে দিলো কথাটা। লিথান হেসে বলে উঠল – “ প্রতিবার যখনি টাইমমেশিন দিয়ে কোনো বছরের সুড়ঙ্গে ঢুকি। তুই এই কথাটাই বলে উঠিস। এভাবেই প্রতিটা বছরের প্রতিটা সুড়ঙ্গেই তুই একই কথা বললি। মানে ২২১ টা সুড়ঙ্গে ২২১ বার। আর আমাদের কপালের কি দুর্গতি ,আমাদের প্রফেসরের কি আদিম কালের টাইমমেশিন …সুড়ঙ্গ দিয়ে হেঁটে যাওয়া লাগে…”—কথাটা বলেই একি সাথে হেসে উঠল দুজন। কথা বলতে বলতে এভাবেই হেঁটে চলল দুজন। আর কিছুদূর যেতেই দেখতে পেলো আলোক রশ্মি। পৌঁছে গেছে তারা। আর কিছুদূর হাঁটলেই ২০১৯। অন্যান্য বছর থেকে তেমন কিছুই পায় নি তারা। পি.এইচ.ডি এর রিপোর্টের আশা ছেড়েই দিয়েছে। ভালোবাসার সংজ্ঞা আর বের করতে পারার আশা করে না তারা। শুধু অনেক সাল ঘুরে ঘুরে রিপোর্ট লিখেছে এইটাই দেখাতে চায় প্রফেসরকে। তাতে যদি কিছু একটা হয় তাহলে ভালোই হয় আর না হলে কিছুযে করার নেই।

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেছে পোর্টাল এর দরজায়। ট্রাকিং প্যাড থেকে পাসোয়ার্ড দিতেই খুলে গেল পোর্টাল এর দরজা। দরজা খুলতেই দেখতে পেলো একটা হলুদ ট্যাক্সি। ২২১ বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনো বছরে এসে এমন কোনো দৃশ্য দেখলো তারা। এর আগে তারা নিজেরাই হেঁটে যেত সবখানে। কারণ টাইম মেশিনে কোনো বছরে যেয়ে ওই সময়ের কোনো মুদ্রা বা যানবাহন ব্যাবহার করলে কপিরাইট খেতে হয় পি.এইচ.ডি রিপোর্টে। শুধু আগে থেকেই ম্যাপ দেখে ওই সময়ের কোনো একটা দেশের কোনো একটা জায়গায় নামতে হয় এক দিনের জন্য। এবারো তারা ম্যাপ সেট করেই এসেছিল। সাথে ভাষাটাও। কিন্তু জায়গাটা ম্যাপ এর সাথে তো কিছুতেই মিলছে না।

ম্যাপ সেট করা নিয়ে লিথানকে জিজ্ঞেস করলো ড্রিচ। “ ম্যাপ এ দেখেছিলাম ভালোবাসার গলি নামের একটা এলাকা। ভালোবাসার গলি নাম দেখে মনে করেছিলাম কিছু হয়ত পাবো। তাই তাড়াহুড়া করে এইখানেই ম্যাপ সেট করেছি। কিন্তু ছবির সাথে তো কিছুই মিলছে না এখানকার” – বলে উঠলো লিথান। বলতে বলতেই ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার সামনে এগিয়ে এলো। বলতে লাগলো –”কোথায় যাবেন আপনারা”। কিন্তু মাইন্ডরিডারটা কাজ করলো না লিথানের। কিছু বুঝতে না দিয়েই ড্রিচ বলে উঠল—“না ভাই যাব না। কিন্তু ভালোবাসার গলিটা কোনদিকে ? “। ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার উত্তর দিলো –” ভালোবাসার গোলি চিনেন না ভাইজান…এলাকায় নতুন তাইলে… আহেন দিয়া আসি… ট্যাক্সিতে উঠেন…”।

লিথান বলে উঠলো –“ না ভাই…আমাদের কাছে টাকা নাই…আমরা হেঁটেই যাব।“। প্রত্যুত্তরে ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার বলে উঠলো—“ ভাইজান যে কি কন… এলাকার নতুনগো কাছে আমি টেকা নেইনা।চলেন দিয়া আসি। “

আগের মানুষদের ভালো ব্যাবহার এর কথা ভার্সিটিতে থাকাকালীন লাইব্রেরিতে একবার পরেছিল একটা বইয়ে,কিন্তু এতো ভালো হবে ভাবতে পারে নি ড্রিচ। অনেক চিন্তা করে দুইজন ঠিক করলো , উঠেই পড়বে ট্যাক্সিতে। একটু অভিজ্ঞতা হয়েই যাক। এই বলেই উঠে পড়লো ট্যাক্সিতে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্যাক্সি চালু হলো। চলতে থাকলো ধীর গতিতে। রাস্তা ঘাটে কোনো মানুষ নেই। নেই কোনো বাড়িঘরও। বেশ অন্যরকমই ঠেকল জিনিসটা। কোনো সালে এমন জনশূন্য নগরী দেখেনি তারা। রাস্তার দুধারে শুধু মাঠ আর মাঠ। কিছুক্ষন যেতেই গাড়ি থামল এক বিশাল অট্টালিকার সামনে। আশেপাশে শুধু মাঠ আর মাঠ ।এর ই মাঝে একটা বিশাল বড় অট্টালিকা। ট্যাক্সি থামিয়েই ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার লোকটি বলে উঠল – “ওয়েলকাম টু ভালবাসার গলি”।

শুনেই লিথান বলে উঠলো – “ গলি কই ? এটাতো ভালোবাসার দালান হবার কথা”। লোকটি হেসে বলল – “ ভালোবাসায় বড় বড় প্রেমিকও দালান ছেড়ে গলিতে নামে স্যার” । বলেই গান ছেঁড়ে দিলো ট্যাক্সিতে লোকটা—” আমার মত এতো সুখী …নয়তো কারো জীবন…”।  লোকটাকে দেখে অনেক কিছু জানার ইচ্ছে হলো ড্রিচের। কিন্তু লিথান বলে উঠল –“চল বেশি সময় নেই“। কথামত ড্রিচ ও নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। এমনিতেই মাইন্ডরিডারটা কাজ করছে না তারউপর এই তারছেরা লোকটা। সবমিলিয়ে তাড়াতাড়ি ভালোবাসার গলি একটু ঘুরে চলে যাওয়াই ভালো।

এইভেবে ট্যাক্সি ড্রাইভ্রারকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় দিলো দুজন। ট্যাক্সি থেকে নেমে প্রথমেই অট্টালিকার দিকে তাকালো ড্রিচ আর লিথান। ৭ তলার এক বিশাল দালান। সামনে লিখা ভালোবাসার গলি। দরজা দিয়ে ঢুকতেই রিসিপশান এ বড় করে সালাম দিলেন হোটেলের কেয়ারটেকার। এসেই বলে উঠলো –“ আসুন আসুন জনাব। আমাদের হোটেল ভালোবাসার গলিতে। আমি এখানকার কেয়ারটেকার – মন মিয়া“। নাম শুনেই ড্রিচ জিজ্ঞেস করলো –” মন মিয়া … আপনার নামটা খুব সুন্দর। তা আপনাদের এখানে কি রুম ভাড়া নেয়া যায় ? ভাড়া নিতে কি করতে হয় ? আর ভাড়া কত? “। জবাবে মন মিয়া বলে উঠলো—“ স্যার, এক এক তলায় এক এক ভাড়া … তলা আছে ৭ টা… নিচের তলা রিসেপশান আর উপরের ২-৬ তলা থাকার রুম…আর ৭ তলা ছাঁদ স্যার। এখানে সব প্রেমিকরা থাকে স্যার। প্রেমিক ছাড়া ভাড়া দেওয়া হয় না। আর ভাড়া স্যার এক এক তলায় এক এক রকম… কোনো কোনো তলায় ফ্রিও থাকতে পারবেন স্যার…রুম না দেখলে বুঝবেন না স্যার …চলেন ঘুরাইয়া দেখাই”।

তৎক্ষণাৎ লিথান বলে উঠলো “ আমারা যে প্রেমিক কিনা সেটার জন্য কোনো প্রমান দিতে হবে না? “। জবাবে মন মিয়া বলে উঠলো – “ স্যার আপনারা প্রেমিকই হইবেন… প্রেমিক না হইলে তো আপনারা বাইরের ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার হইতেন…আসেন স্যার রুম দেখাই” । মন মিয়ার কথাটা ড্রিচ আর লিথানের কেউ ই বুঝে উঠতে পারলো না।

মন মিয়ার পিছনে হাঁটতে থাকলো তারা। সিঁড়ির কাছে এসেই বুঝা গেলো গলি নামকরনের কারণ। এমন আজব সিঁড়ি এই প্রথম দেখলো দুজন। গলির মত লম্বা চিকন সিঁড়ি , তাঁর উপর এমন ভাবে বানানো যে নিচে নামার উপায় নেই। এমন ভাবেও সিঁড়ির নকশা করা যায় ভাবেই নি ড্রিচ আর লিথান। মন মিয়া বলে উঠলো—” স্যার একবার উপরে উঠলে নামার আর সুযোগ নাই। একবারে ৭ তলা পর্যন্ত যাইতেই হইব। ৭ তলা থাইকা নামার সিঁড়ি আসে স্যার। মানে স্যার যে যত উপ্রের তলায় থাকব তাঁর তত সুবিধা“। হাঁসতে হাঁসতে বলল মন মিয়া।

কথা শুনে ভালোবাসা যে আসলেই জটিল জিনিস মনে মনে আজ এই প্রথম ভাবতে থাকে ড্রিচ। সাথে সাথে লিথান তাকায় ড্রিচ এর দিকে। মাইন্ডরিডারটা কাজ করছে আবার। আজব বিষয় ট্যাক্সি ড্রাইভ্রার এর বেলায় মাইন্ডরিডারটা কাজ করলো না কেনো ? ২২৪১ সালের যন্ত্র ও যে ডিস্টার্ব করে তা ভেবে অবাক লাগে লিথানের।

( চলবে… )

পরবর্তী পর্ব — পর্ব-২ঃ ওয়েলকাম টু ভালবাসার গলি – ” প্রেমের ঊর্ধ্বযাত্রা “

 

Comments are closed.

ব্রেকিং নিউজ