পর্ব-১ঃ অত্যয় – ” নিঃসঙ্গ জামিল “পাঠের সময় : 6 মিনিট

লেখকঃ মোঃ মতিউল্লাহ

সকাল থেকে মনটা বডড খারাপ কোন কাজে মন বসছে না। বেলা ১১ টা বাজতে ৩ মিনিট বাকি। এখনাে সকালের খাবার খাইনি কি করে খাবাে? মন খারাপ থাকলে খাবার- দাবারের প্রতি খিদের প্রতি কোন মন থাকে না। কি করবাে বুঝতেছিনা। মা তার ঘরথেকে কয়েকবার খেতে বলেছেন। কিন্তু তিনিও না খেয়ে মন খারাপ করে বসে আছে।সত্যি বলতে উনারও মন খারাপ মন খারাপ করে দুজন আলাদা দুই ঘরে বসে আছি।এমন না যে মায়ের সাথে আমি অভিমান করে বসে আছি বা মা আমার উপর অভিমান করে বসে আছে। এমনটি হলে বেলা গড়ে ১১ টা বাজতাে না। অনেক আগেই মা-ছেলের মধ্যে ভাব হয়ে যেত। আমি বিছানা থেকে উঠে ঘর থেকে বের হয়ে মায়ের ঘরে উকি দিলাম।তার চোখ ভেজা।সকাল থেকে কান্না করে যাচ্ছেন।অনবরত কান্নার ফলে চোখ লাল হয়ে আছে।

আমি দরজার বাহিরে দাড়িয়ে বললাম, খেয়ে নাও মা। অনেক বেলা হল। না খেলে পরে আবার তােমার শরীর খারাপ করবে। খেয়ে নাও মা।

কোন জবাব পেলাম না আমি। ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় গিয়ে দাড়ালাম। মাথাকে উর্ধ্বমুখী করে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম।হঠাৎ কাধে কারাে হাত পড়লাে আমি অনুভব করলাম কিন্তু তাকালাম না।

সে বললাে- দিনের বেলা আকাশের তারা গুনছিস নাকি?
বামে তাকিয়ে দেখলাম সে খালেদ। আমার ডান কাধে হাত রেখে সে দাড়িয়ে আছে।

আমি বললাম-ওহ,তুই?
অবাক হলি নাকি রে? (খালেদ)
অবাক হওয়ার কি আছে?
তা এই দুপুরবেলা আকাশ পানে তাকিয়ে কি দেখছিস? আমিও দেখি। (খালেদ)
দেখার মতাে কিছু দেখলে অবশ্যই বলতাম।
তবে হা করে তাকিয়ে ছিলি যে? (খালেদ)
আকাশতাে অনেক বিশাল,তাই না খালেদ?
হ্যাঁ, আকাশ অনে…ক বিশাল। (খালেদ)

তবে মনে কর, এই বিশাল আকাশের সাথে আমার ক্ষুদ্র মনের সংযােগ স্থাপনের চেষ্টা করছি। এত কষ্ট আর মেনে নিতে পারছি না কিছু আকাশকে দিয়ে নিজে হালকা হতে চাচ্ছি।

কি সব আবােল-তাবােল বকছিস? কি হয়েছে রে তাের? (খালেদ)

জানিস খালেদ,আমরা মধ্যবিত্ত কিন্তু আমাদের জীবনে কখনাে আমরা কষ্টের সম্মুখীন হইনি।বাবা আমাদের সুখের জন্য অনেক পরিশ্রম করেছেন। বটবৃক্ষের মতাে বাবা আমাদের ছায়া দিয়ে গেছেন। হঠাৎ স্ট্রোকে বাবা মারা গেল। জীবনে প্রথম ধাক্কাটা সেদিন খেলাম। এত কষ্ট এর আগে কখনাে পাইনি। হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম।বাবার মৃত্যুের শােক কাটিয়ে স্বাভাবিক হলাম টিউশনি করে পরিবারের হাল ধরলাম।এত খরচ লাগে না। পরিবারে শুধু আমি আর মা। প্রতিমাসের খরচ মিটিয়ে চার-পাঁচ হাজার টাকা ব্যাংকে রাখতে পারছি বাবার পেনশনের টাকার সাথে। কত সুন্দর আমাদের দিন কাটতেছিল কিন্ত…


কিন্তু কি জামিল? বল আমায়। (খালেদ)

না তেমন কিছু না। এখন যাইরে। পরে কথা হবে। মায়ের শরীরটা বেশী ভালাে না।

বিদায় নিয়ে চলে আসলাম বাড়িতে। মা তার পূর্বের অবস্থানেই রয়েছে। আমি তার পাশে বসলাম। গলায় ঝড়িয়ে একটু সান্তনা দিতে চাইলাম তিনি আমার কাধে মাথা রেখে বাচ্চাদের মতাে কান্না শুরু করলাে। আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। কান্না করাে না মা। আসাে আমরা দুজন মিলে খেয়ে নিই। যদিও আমার খিদে পায়নি। তবুও মায়ের জন্য খেতে হবে। এত বেলা পর্যন্ত না খেয়ে থাকলে মায়ের শরীর খারাপ করবে। আর আমি না খেলে সে এখন খাবে না। তাই মাকে খাওয়ার কথা বললাম। মায়ের শরীরে ইনসুলিন পুশ করিয়ে খাবার নিয়ে আসলাম নিজ হাতে মাকে খাওয়ালাম নিজেও খেলাম। মা কোন কথা বললাে না। অপলােকে তাকিয়ে থেকে আমার দেয়া লােকমাগুলাে মুখে নিয়ে ধীরে ধীরে চিবুতে থাকলেন। হঠাৎ মা বললাে-তুই খা বাবা,আমি আর খাবাে না।

আমি জোর করলাম না। যতটুকু খেয়েছে তা এই পরিস্থিততে যথেষ্ট পানির গ্লাস আর ঔষুধ এগিয়ে দিয়ে আমিও হাত ধুয়ে নিলাম। সবকিছু গুছিয়ে গােসল করতে গেলাম। গােসল সেরে রওনা হলাম টিউশনের উদ্দেশ্যে।

প্রখর রােদে একা একা হাঁটতে হাঁটতে আবার মন খারাপ হয়ে গেল। কেন জানি মনে হল মনের কষ্টগুলাে যদি কাউকে বলতে পারতাম তবে বােধ হয় একটু স্বস্তি লাগতাে কাকে বলবাে এসব কথা?এসব লজ্জাজনক কথা মানুষকে বলা যায় নাকি? যদিও কাউকে বিশ্বাস করে বলি তবে ভবিষ্যতে সে যে আমাকে এই কথা দ্বারা আক্রমন করবে না তার নিশ্চয়তা কি? তার তা কোন নিশ্চয়তা নেই। থাক,কাউকে বলতে হবে না।মনের কথা মনেই থাকুক।

এসব ভাবতে ভাবতে ছাত্রের বাড়িতে চলে আসলাম। স্বাভাবিক হয়ে ছাত্রকে পড়াতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার ছাত্র যথেষ্ট মেধাবী এবং চতুর সে আমার কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী পড়া পাচ্ছে না। তাই সে আমায় প্রশ্ন করলাে- স্যার,আপনার কি মন খারাপ?

ঠিক তখনই আমার ফোনটা বেজে উঠলাে। খালেদ কল দিয়েছে। কল রিসিভ করলাম।
হ্যাঁ,খালেদ বল।
তুই কি কোন সমস্যায় আছিস? থাকলে বল যতটা সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করবাে। (খালেদ)
আমি টিউশনে আছিরে। বের হয়ে তােকে কল দিচ্ছি।
আচ্ছা,ঠিক আছে। (খালেদ)
ফোনটা রেখে আমার ছাত্রকে বললাম-
না,মন খারাপ না।
তবে স্যার আপনার চেহারা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে কেন?
ও কিছু না। একটা কাজের দায়িত্ব পেয়েছিতাে। একটু চাপে আছি। তাই হয়তাে এমন দেখাচ্ছে।

আপনার কিছু হয়েছে স্যার। আপনি আমায় মিথ্যা বলছেন। স্যার হয়ে যদি আপনি মিথ্যা বলতে পারেন তবে আমিও আপনার ছাত্র হয়ে এখন থেকে মিথ্যা বলবাে।আর কেউ যদি আমায় বলে এত মিথ্যা বলা শিখলে কার কাছ থেকে? আমি আপনার নাম বলে দিবাে।

কি মুশকিলে না পড়লাম। নাছােরবান্দা ছেলে, পেটের কথা বের করেই ওর শান্তি হবে।সত্য কথা না বলা পর্যন্ত এভাবে হয়রানি করবে।তাই আমি সত্যিটা বলে দিলাম- হ্যাঁ আমার আজ মনটা ভালাে নেই।

কেন স্যার, কি হয়েছে?
মায়ের শরীরটা ভালাে না। তাই দুঃচিন্তা হচ্ছে।
তবে এই মুহূর্তে আপনাকে আপনার মায়ের পাশে থাকা দরকার আপনি বরং আজ চলে যান।আমি নিজে নিজে হােম ওয়ার্ক করে নিবো।
একা একা করতে পারবে?
একশ বার পারবাে। আপনার সমস্যা তাই আমাকে পারতেই হবে।
আচ্ছা,আজ তবে আসি আমি।তােমার আম্মুকে বলে দিও।
আচ্ছা স্যার।

টিউশন থেকে বের হয়ে একটা টং দোকানে বসে চা খাচ্ছি আর ভাবছি ব্যাপারটা কি খালেদের কাছে প্রকাশ করবাে কিনা। সু-মন সায় দিচ্ছে বলার জন্য আর কু-মন দিচ্ছে না। যদিও খালেদ আমার খুব ভালাে বন্ধু সব কথাই আমি তার কাছে প্রকাশ করি। তাই এই কথাটাও বলা যেতে পারে। কিন্তু এ কথাটা তাকে কীভাবে বলি? চায়ের দোকানে রেডিওতে গান বাজতেছে। আব্দুল জব্বারের গান-

“এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি কেন একা বয়ে বেড়াও?
আমায় যদি তুমি বন্ধু মান,কিছু জ্বালা আমায় দাও।”

গানের কথা গুলাে আমার কানে বার বার বাজতে লাগলাে আমি ভাবলাম সত্যিই কি এই জ্বালার ভাগ অন্যকে দিতে পারবাে? সত্যিই কি অন্য কেউ এই জ্বালার ভাগ নিতে রাজি হবে? আমি মােবাইল হাতে নিয়ে কল দিলাম খালেদকে।

হ্যালাে খালেদ?
হ্যাঁ বল।
কোথায় তুই?
বাড়িতে।
ব্যস্ত নাকি?

নাহ।
তবে স্কুল মাঠে চলে আয়। তর সাথে কথা আছে।

আমিও রওনা হলাম স্কুলের উদ্দেশ্যে। বিকাল ৩টা ২৩ মিনিটে আমি মাঠে পৌছালাম গিয়ে দেখি খালেদ মাঠের ঘাসের উপর বসে আছে। আমি খালেদের পাশে গিয়ে বসলাম। খালেদ বললাে- তর কি হয়েছে? তুই কিন্তু তা আমাকে এখনাে বলছিস না।
এত তাড়া কিসের? বলবাে সব বলার জন্যই তােকে এখানে আসতে বলেছি।
বল তবে।
আচ্ছা আমাদের বন্ধুত্ব কত বছরের?
ন্যাংটা কাল থেকেইতাে আমরা একসাথে চলি সেই হিসেবে বিশ বছরতাে হবেই।
তুই আমার এবং আমার পরিবার সম্পর্কে কতটা জানিস?
তুই যতটা বলেছিস আর আমি যতটা দেখেছি ততটাই জানি।তুইতাে আমায় সবই বলিস।
সবই বলি,কিন্তু সবটা বলি না। জানিস খালেদ,তােকে সব বলি বলেই আজ মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি। মনের সাথে আর পেরে উঠতে পারছি না। খুব অস্বস্তি লাগছে। একা এই ব্যাথা আর বইতে পারছি না। তুই কি আমার দুঃখের ভাগ নিবি?

কেন নিবাে না? আমরাতাে বন্ধু না,ভাই! আমরা দুজন ভাই! we are two brothers from different mother.
আমি তার কথা শুনে তার হাতে ধরে কেদে ফেললাম।সে আমায় সান্তনা দিলাে।কাদতে বারণ করলাে।আমি স্বাভাবিক হলাম।

সে আমায় বললাে-ঘটনা কি খুলে বল।

শােন তবে…

আমার বাবা আর লুতফর আঙ্কেল খুব ভালাে বন্ধু। আমার আর তাের মতাে। যদিও তাদের বন্ধুত্ব ছােট বেলার না।কিন্তু তাদের বন্ধুত্ব এতই ঘনিষ্ঠ ছিল বােঝার কোন উপায়ই নেই তারা যে চাকুরী সূত্রের পরিচয়ে বন্ধু হয়েছে।লুতফুর আঙ্কেল প্রায়ই আমাদের বাড়ি আসতেন। তিনি অবশ্য আমাদের মহল্লার দিদার বক্সের বাড়িতে ব্যাচেলর হিসেবে ভাড়া থাকতেন। তার বাড়ি ময়মনসিংহ সেখানে তার পরিবার থাকে। চাকুরির সুবাদে তিনি এখানে থাকেন। তিনি ব্যাচেলর হিসেবে থাকেন বলে আমার বাবার খারাপ লাগতাে। তাকে অনেক অনুরােধ করতাে আমাদের বাড়িতে থাকার জন্য। তিনি রাজি হননি থাকতে কিন্তু নিয়মিত তার আসা-যাওয়া ছিল। মা প্রায় সময়ই তাকে বক্সে ভরে খাবার দিয়ে দিতাে। সে লােভেই মনে হয় তিনি আসতাে। আমাদের দুই ভাই-বােনকে তিনি অনেক আদর করতেন। সব সময় আমাদের জন্য চকলেট,চিপস নিয়ে আসতেন। তাই এই লােকটার আগমন আমাদের দুই ভাই-বােনের কাছে ভালােই লাগতাে। এভাবে দিন কাটতে লাগলাে। এক পর্যায়ে তাদের দু’জনার চাকুরি থেকে অবসর নেয়ার সময় হল।

( চলবে… )

ব্রেকিং নিউজ